নয়া জামানা ডেস্ক : মৃতদের তালিকা থেকে টেনে এনে জ্যান্ত মানুষকে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে ‘মৃত’ তকমা পাওয়া ২২ জনকে হাজির করে মমতা বুঝিয়ে দিলেন, আসন্ন নির্বাচনে এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে লড়াইটা তিনি ‘ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে’ লড়বেন। নির্বাচন কমিশনকে ‘বিজেপির তল্পিবাহক’ এবং ‘দালাল’ বলে আক্রমণ শানিয়ে এদিন ধরনা মঞ্চ থেকেই গণ-আন্দোলনের ডাক দিলেন তৃণমূলনেত্রী। সাফ জানালেন, কেবল আইনি লড়াই নয়, রাজপথেই হবে ফয়সালা। এদিন রাতেও তিনি ধরনা মঞ্চের পেছনের অস্থায়ী ঘরেই থাকবেন বলে জানিয়েছেন।
শুক্রবার দুপুরে ধর্মতলায় যেন এক অদ্ভুত সমাপতন। যে ভোটার তালিকায় মৃত বলে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে, সেই মানুষরাই সার বেঁধে দাঁড়ালেন মমতার পাশে। নেত্রী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘মৃত ঘোষণা করেছেন, তাঁরা জীবিত আছেন। তাঁদের মঞ্চে হাজির করব। নির্লজ্জ বেহায়া পার্টি। তাঁদের দালাল কমিশন। আমরা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে কাজ করি। কমিশনের খাতায় ওঁরা মৃত। আজ তাঁদের প্যারেড করাব। মিডিয়াকে আমি রিকোয়েস্ট করব, ওঁরা বেঁচে আছেন। ২২টি পরিবার আসবে। আমরা তাঁদের দীর্ঘায়ু কামনা করি।’ মমতার দাবি, ভোটার তালিকায় প্রায় ৫ লক্ষ জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বিজেপিকে সরাসরি বিঁধে মমতা বলেন, ‘নির্লজ্জ, বেহায়া বিজেপি। আর নির্বাচন কমিশন তাদের তল্পিবাহক।’ তাঁর সাফ কথা, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটারদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই ‘স্বেচ্ছাচারিতার’ বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলা হবে। দিল্লির ধরনায় যাওয়া আটটি পরিবারের সদস্যদেরও এদিন মঞ্চে দেখা যায়। মমতা স্পষ্ট করে দেন, তাঁর নিজের পাড়াতেও এমন ‘জীবিত-মৃত’ কেস আছে এবং শনিবার তাঁদেরও তিনি ধরনা মঞ্চে হাজির করবেন।
এদিন মমতার মঞ্চে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁ রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের প্রেসিডেন্ট এক সন্ন্যাসী প্রতিবাদ জানাতে আসেন। ২০০২ সাল থেকে ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও ২০২৬-এর তালিকায় তাঁর নাম নেই। ওই সন্ন্যাসী আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমি রামকৃষ্ণ সারদা মিশন থেকে এসেছি। আজ ১৪ বছর হল মিনাখাঁ রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের প্রেসিডেন্ট। তা সত্ত্বেও আমার নাম বাতিল করা হয়েছে। আমি বেলুড় মঠের দশম প্রেসিডেন্ট স্বামী বীরেশ্বরানন্দের মন্ত্রশিষ্য। আমি আজ দিদির কাছে এলাম। বললাম, এ রকম যদি হতে থাকে তা হলে তো দেশের অবস্থা তো খুব খারাপ হবে।’ ওই সন্ন্যাসী ঠাকুর-মা-স্বামীজির কাছে এসআইআর ব্যবস্থা প্রত্যাহারের প্রার্থনাও জানান।
মমতার এই প্রতিবাদী মঞ্চে এদিন চাঁদের হাট বসেছিল। যোগ দিয়েছিলেন কলকাতার প্রাক্তন নগরপাল তথা তৃণমূলের রাজ্যসভা প্রার্থী রাজীব কুমার। উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী ও প্রার্থী মেনকা গুরুস্বামী। কমিশনকে বিঁধে মেনকা বলেন, ‘আমরা ব্রিটিশদের তাড়িয়েছি। সংবিধান বানিয়েছি। সেই সংবিধান সবাইকে ভোটাধিকার দিয়েছে। সবার ভোট দেওয়ার অধিকার আছে। যদি তা না থাকে তাহলে মুক্ত এবং স্বচ্ছ নির্বাচন কীভাবে হবে?’ মেনকার বক্তব্য শুনে আপ্লুত মমতা বলেন, ‘মেনকা খুব ভালো। হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।’
সুর চড়ান শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরাও। গায়ক কবীর সুমন বলেন, ‘এটা আমার অধিকার। মৌলিক অধিকার রক্ষার লড়াই। কারও অপছন্দ বলে কিছু করার নেই। আমি ভাবতে পারিনি বিজেপি এই পরিমাণে নির্বোধ। তাদের মাথায় কিচ্ছু ঢোকেনি। বিজেপি কিছুতেই জিতবে না। আমি আবারও বলি আমি তৃণমূল সমর্থক নই। আমাদের শহরটা আগে এত সুন্দর ছিল না মোটেই আমার পাশে বসে থাকা মানুষটির (মমতা) কল্যাণেই হয়েছে।’ সুমন এদিন মমতার অনুরোধে ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ এবং ‘পথে আবার নামো সাথী’ গান দুটি গেয়ে শোনান। অন্যদিকে, কবি জয় গোস্বামী সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, ‘অন্যায় হচ্ছে, মানুষের ভোট অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এটা আমার ব্যক্তিগত কথা নয়। ৯০ বছর অতিক্রান্ত মানুষকে যেতে হচ্ছে প্রমাণ দিতে। কেউ আত্মহত্যা করছেন, মারা যাচ্ছেন।’
বিকেল গড়াতেই ধরনা মঞ্চে উত্তাপ ছড়ায় পার্শ্বশিক্ষকদের বিক্ষোভ। যা দেখে মেজাজ হারান মমতা। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, এর পেছনে বিজেপির মদত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা সময় নয়, মানুষ মরছে। বিজেপি মাইন্ডেড সব। এদের এখানে কারা পাঠিয়েছে জানি। বিজেপি এসবের পিছনে। মানুষ মারা গেছে, তাদের জন্য আমরা এখানে এসেছি। বাকিদের দাবিও আছে। তাদের জন্য অন্য জায়গা আছে। মোদি, অমিত শাহ, ভ্যানিশ কুমারের কাছে যান।’
সন্ধ্যে ৮টা নাগাদ মূল মঞ্চের বক্তৃতা শেষ হলেও মমতা জানিয়ে দেন, তিনি রাতে ওখানেই থাকছেন। তাঁর সঙ্গে পরিবারের কয়েকজন সদস্যও থাকবেন। বক্তৃতা শেষে মঞ্চেই ‘দিদি’কে প্রণাম করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতাও তাঁর উত্তরসূরির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেন, ‘এসআইআর নিয়ে অভিষেক ভালো কাজ করেছে। ও খুব ভালো বলেছে।’ আগামিকাল শনিবার সকাল ১০টায় ফের ধরনা মঞ্চে ফিরবেন মমতা। নেতা-কর্মীদেরও সেখানে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে ধর্মতলার রাজপথ এখন ভোটার তালিকা সংশোধন ইস্যুতে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ছবি সোশ্যাল মিডিয়া ।