নয়া জামানা ডেস্ক : ‘বাংলা-বিহার ভাগ করে নাকি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হবে। একবার বাংলায় হাত দিয়ে দেখাক! বেশি বাড়াবাড়ি করলে দিল্লির সরকার ফেলে দেওয়া হবে।’ বঙ্গভঙ্গ জল্পনার অভিযোগের বিরুদ্ধে ঠিক এই ভাষাতেই শনিবার ধর্মতলার ধরনামঞ্চ থেকে সরাসরি কেন্দ্রকে হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি নেতাদের পৃথক উত্তরবঙ্গ বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের দাবির কড়া সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট জানান, বাংলার এক ইঞ্চি জমিও তিনি ছাড়বেন না। প্রশাসনিক সুবিধা বা সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে বিভাজনের যে রাজনীতি চলছে, তার নেপথ্যে ‘শয়তানদের’ মস্তিষ্ক কাজ করছে বলে অভিযোগ করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। দিল্লির মোদী সরকারকে নিশানা করে তাঁর তোপ, এই সরকার চন্দ্রবাবু নায়ডুর দয়ায় ‘টিমটিম’ করে জ্বলছে। তাই বাংলার গায়ে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখালে পরিণাম হবে মারাত্মক। এসআইআর ইস্যুতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া ধরনামঞ্চ থেকেই এদিন জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সফর নিয়ে মেজাজ হারালেন মুখ্যমন্ত্রী।
এসআইআর বিরোধী ধরনামঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা সাফ জানান, বাংলা কিংবা বিহার ভাগ করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গড়ার যে ছক বিজেপি কষছে, তা কোনওভাবেই সফল হতে দেবেন না। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনিক সুবিধার দোহাই দিয়ে আসলে বাংলাকে টুকরো করতে চাইছে গেরুয়া শিবির। টুইটার বা এক্স হ্যান্ডেলের একটি তথ্যের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কাল আমি একটি টুইটে দেখলাম, দিল্লির বাবুরা খাইয়েছে, বাংলা-বিহার ভাগ করে নাকি ইউনিয়ন টেরিটরি করবে। বাংলায় হাত দিয়ে দেখ। ওদের ধান্দাবাজি হচ্ছে বাংলা ভাগ করার, আবার একটা বঙ্গভঙ্গ করার।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিহার ভাগ করে ঝাড়খণ্ড করেছে। ডাবল ইঞ্জিন সরকার যেখানেই সরকারে থাকবে, সেখানেই লুটেপুটে খাবে।’
শনিবার শিলিগুড়ির অনুষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রপতির করা অনুযোগের পাল্টা জবাব দিয়ে মমতা বলেন, ‘আই অ্যাম সরি ম্যাডাম। আই হ্যাভ গ্রেট রিগার্ডস ফর ইউ। বাট ইউ আর ট্র্যাপড বাই দ্য বিজেপি’স পলিসি।’ রাষ্ট্রপতির উত্তরবঙ্গ সফরে মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্যের মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার সপাটে জবাব দিয়েছেন তিনি। মমতার সরাসরি অভিযোগ, বিজেপি রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে রাজনীতি করাচ্ছে এবং তাঁকে একটি বিশেষ দলের ‘এজেন্ডা’ প্রচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের কোনো গোপন পরিকল্পনা নিয়ে আগে থেকে ‘গান গেয়ে’ রাখা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘বিজেপির পরামর্শে বিধানসভা ভোটের সময় রাজনীতি করবেন না। এসআইআর নিয়ে একটাও কথা বললেন না তো? কত আদিবাসীর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই খবর রেখেছেন?’ আদিবাসী সমাজ মমতার সরকারের সুবিধা পায় না, রাষ্ট্রপতির এই আশঙ্কার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, মণিপুরের হিংসা বা আদিবাসীদের ওপর অন্য রাজ্যে আক্রমণের সময় কেন রাষ্ট্রপতি চুপ থাকেন?
ধর্মতলার ধরনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা সাফ জানান, তাঁর কাছে মানুষের অধিকার রক্ষা করা সবার আগে। রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠান সম্পর্কে রাজ্য সরকার সম্যক অবগত ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, ‘আপনি কবে আসবেন, কবে যাবেন, সেই ইনফর্মেশন আমরা পাই। সেই মতো চেষ্টা করি প্রস্তুতি নেওয়ার। কিন্তু রেগুলার যদি, কোনো দিন এ আসছেন, কোনো দিন বি, কোনো দিন সি আসেন, আমাদের কি কাজকর্ম নেই নাকি? সারা দিন আপনাদের লেজুড় হয়ে ঘুরে বেড়াব? না কি লাটাই নিয়ে ঘুরতে হবে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য?’ বছরে একবার এলে তাঁকে স্বাগত জানানো সম্ভব, কিন্তু ঘনঘন সফরে সারাক্ষণ সরকারি কাজ ফেলে ঘুরে বেড়ানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলে তিনি সোজাসুজি জানিয়ে দেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বর্তমানে ভোটার তালিকা থেকে সাধারণ মানুষের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি তাঁর কাছে সবথেকে বড় ‘প্রায়োরিটি’। রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে তাঁর শাণিত কটাক্ষ, ‘ইউ আর প্রায়োরিটি অফ বিজেপি। মাই প্রায়োরিটি ইজ পাবলিক। কোন সংগঠন ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আমি-ই জানি না।’
রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়নের খতিয়ান দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জয় জোহার প্রকল্প এবং অলচিকি লিপির প্রসারে তাঁর সরকারের অবদানের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে বলানো হচ্ছে যে বাংলায় আদিবাসীদের উন্নয়ন হয়নি, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মমতার অভিযোগের তির সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দিকে। তিনি বলেন, ‘মাথায় যে আছে সেও সর্বগ্রাসী। দেশ জুড়ে নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহের অত্যাচার চলছে।’ এসআইআর-এর নামে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যে চেষ্টা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধেই এই আন্দোলন বলে তিনি দাবি করেন। সদ্য তৃণমূলের হাত ধরা প্রতীক-উর রহমানও এদিন মঞ্চে উপস্থিত থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়ান এবং ‘আমরা কাগজ দেখাব না’ বলে হুঙ্কার দেন।