নয়া জামানা ডেস্ক : এসআইআর-এর নামে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগ দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার ধর্মতলার ধরনা মঞ্চ থেকে চড়া সুরে বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘ভোটের আগেই ভোট করে দিচ্ছেন! বড় হনু হয়ে গেছেন! প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলুন মিস্টার ভ্যানিশ কুমার।’ তৃণমূল নেত্রীর দাবি, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির দোহাই দিয়ে বিশেষ করে মহিলাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি নিজের পরিবারের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, তাঁর বাড়ির এক মেয়ের বিয়ে হওয়ার পর ঠিকানা বদলাতেই নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। মমতার সাফ হুঁশিয়ারি, ‘মানুষকে ভোট দিতে দিতে হবে। ভোটাধিকার কেড়ে নিতে দেব না।’
ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে তৃতীয় দিনের ধরনায় মুখ্যমন্ত্রী এদিন রাজ্য রাজনীতিতে ফের ‘খেলা হবে’ স্লোগান ফিরিয়ে আনেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের আবহকে হাতিয়ার করে তিনি বলেন, ‘রাজনীতির খেলা হবে ভোটের সময়।’ তবে ক্রিকেট ম্যাচের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এদিন দেড় ঘণ্টা আগেই সভা শেষ করার কথা ঘোষণা করেন তিনি। খেলাধুলো আর রাজনীতিকে এক সুতোয় বেঁধে তাঁর মন্তব্য, ‘বাংলা খেলাধুলো ভালোবাসে সবসময়। আজ ফাইনাল। আর রাজনীতির খেলা হবে ভোটের সময়।’ সামনেই ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন, তার আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই রণংদেহি মেজাজ রাজনৈতিক মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
এদিনের মঞ্চ থেকে রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের আকস্মিক পদত্যাগ নিয়েও বিস্ফোরক দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতার অভিযোগ, রাজভবনের প্রাক্তন কর্তাকে ভয় দেখিয়ে এবং চাপ দিয়ে পদত্যাগ করানো হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘গভর্নরকে চলে যেতে হল কেন? একটা এনকোয়ারি হয়ে যাক!’ রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর বঙ্গসফরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির আগমনের দিন রাজ্যপালের তাঁকে স্বাগত জানাতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিজেপি ষড়যন্ত্র করে তাঁকে দিল্লি নিয়ে গিয়ে ইস্তফা দেওয়ালো। বিজেপির উদ্দেশে তাঁর কটাক্ষ, ‘কাজের সময় কাজী, কাজ ফুরোলেই পাজি!’ মমতার দাবি, বিজেপি এখন নিজের ‘ইয়েসম্যান’ বসানোর চক্রান্ত করছে।
বিজেপিকে ‘অ্যান্টি-মহিলা’ আখ্যা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গেরুয়া শিবির অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাংলার মহিলাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে ছাঁটাই করছে। তাঁদের ভাষা ও সংস্কৃতি বোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। মমতার কথায়, ‘ওরা নাকি এই রাজ্যকে ‘সুনার বাংলা’ করবে। কীভাবে করবে? ‘বঙ্কিমদা’, স্বামী রামকৃষ্ণ, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গে, শ্রীরামপুরে মিটিং করতে গিয়ে লিখছে শীরেমপুর।’ বিজেপি নেতাদের টেলিপ্রম্পটার নির্ভরতা নিয়ে বিদ্রূপ করে তিনি বলেন, ওটা না থাকলে এঁরা হেলিকপ্টারে উড়ে চলে যাবেন।
স্বাধীনতার ইতিহাস টেনেও বিজেপিকে তুলোধোনা করেন মমতা। জনবিন্যাস নিয়ে বিজেপির অপপ্রচারের জবাবে তাঁর প্রশ্ন, ‘আচ্ছা দেশ স্বাধীন হয়েছে তখন কি আমি জন্মেছিলাম? আসলে ওরা সাইক্রিয়াটিক রোগী।’ তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি যখন ব্রিটিশদের দালালি করছিল, তখন বাংলার বিপ্লবীরা দেশের জন্য লড়াই করছিলেন। ইতিহাস বিকৃতির প্রসঙ্গ তুলে তাঁর দাবি, এনসিইআরটি-র বই থেকে মহাত্মা গান্ধী, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকীদের নাম মুছে ফেলা হচ্ছে। এমনকি ১০০ দিনের কাজ থেকেও গান্ধীর নাম সরিয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ উগরে দেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তৃণমূল নেত্রী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নামে ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারো না।’ তাঁর মতে, এসআইআর আসলে এনআরসি এবং সিএএ-র পথে হাঁটার একটি ‘এক্সট্রা ফায়ার’। বিহার বা অসমে এমনটা না হলেও বেছে বেছে বাংলাকেই কেন টার্গেট করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে রান্নার গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে হাঁড়ি-কড়াই হাতে বিক্ষোভও দেখান তিনি। সব মিলিয়ে ধরনামঞ্চ থেকে মোদী সরকারকে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বিধানসভা ভোটের আগে সুর সপ্তমে চড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি সোশ্যাল মিডিয়া।
রাজ্যপালের ইস্তফায় ‘স্তম্ভিত’ মমতা, কেন্দ্রের ‘চাপ’ তত্ত্বে সরব বিরোধীরাও