নয়া জামানা ডেস্ক : রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বড়সড় কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। বুধবার ভবানীপুরের এক সভা থেকে এই নিয়ে সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে বিঁধেছেন তিনি। মমতা জানান, প্রথমে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। এখন ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতির অজুহাতে আরও বহু নাম কাটা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়লে তিনি চরম পদক্ষেপ করবেন। গণতন্ত্র রক্ষায় প্রয়োজনে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী । এদিকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত সমস্ত নথি বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার মধ্যে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। আবার জানিয়ে দিয়েছে,মাধ্যমিকের শংসাপত্রের সঙ্গে অ্যাডমিট কার্ড গ্রাহ্য হলেও শুধু অ্যাডমিট কার্ড চলবে না। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যতটুকু কাজ শেষ হবে, তার ভিত্তিতেই প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। কমিশন সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে ৫৩২ জন বিচারককে। তথ্যগত অসঙ্গতি যাচাইয়ে ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড থেকেও বিচারক আনা হতে পারে বলে খবর।
এদিন ভবানীপুরে জৈন সম্প্রদায়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ এসআইআর চলছে, অনেকের ভোটাধিকার বাদ গেছে। আমি দুঃখিত, প্রথমে ৫৮ লক্ষ বাদ দিয়ে দিল। তার পর আবার লুকিয়ে লুকিয়ে বাদ দিচ্ছে, যে রুলস প্রথমে ছিলই না, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নাম করে ৫০ লক্ষ নয়, ৮০ লক্ষ হবে। ২০ লক্ষ ভোটার যদি মারাও গিয়েছে ধরে নিই, তা হলে প্রায় এক কোটি ২০ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ চলে যাবে। ’ মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষের নাম ‘ছুপা রুস্তম’ সেজে অতি গোপনে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি ইতিমধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। পিটিশন এখনও বিচারাধীন থাকলেও কমিশনের অতিসক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়াকে কার্যত কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে মমতা বলেন, ‘ আমি নিজে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করেছি। পিটিশন এখনও পেন্ডিং রয়েছে। আদালতের আদেশের পর বহু দিন কেটে গিয়েছে। আমি জানি না ২৮ তারিখ যে তালিকা প্রকাশ করবে তাতে কী হবে । ’ আদালতের নির্দেশের পরেও তালিকা সংশোধনে কেন গড়িমসি হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘ সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর ১৪ তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও, লুকিয়ে লুকিয়ে এই ছুপা রুস্তমেরা কী করছে? এক কোটি কুড়ি লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হতে পারে। ’ নাম বাদ পড়া মানুষদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, ২৮ তারিখ নাম না দেখলে সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থা কী হবে, তা ভেবে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মুখ্যমন্ত্রী এদিন মানবিকতার বার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট বলেন, ‘ আমি মানবতার পক্ষে। এটা দেখতে হবে না কে তৃণমূল, কে বিজেপি, কে সিপিএম। কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে শিখ, কে জৈন, কে খ্রিস্টান। আমি শুধু নিশ্চিত করতে চাই যে দেশের গণতন্ত্র যেন সুরক্ষিত থাকে। আর প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত থাকে। ’ ভোটার তালিকা থেকে কাউকে বাদ দেওয়ার চেষ্টার কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বার করে দেওয়া হলে আমি তার বিপক্ষে। আদালতের অর্ডারে চার-পাঁচ দিন হয়ে গিয়েছে। এর পরেও কোনও কাজ শুরু হচ্ছে না। আমি তাঁদের জন্য প্রার্থনা করছি। যেন মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকে, তাঁদের অধিকার যেন কেউ কেড়ে নিতে না পারে। যাঁর যাবতীয় কাগজপত্র রয়েছে, তা সত্ত্বেও তাঁকে বাদ দেওয়া হলে আমি তাঁদের পাশে থাকব। আমার কথা, জিও অওর জিনে দো। ’
এদিকে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও একাধিক পরীক্ষার কারণ দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিদলের সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। ১ মার্চ রাজ্যে আসার কথা থাকলেও নবান্নের অনুরোধে সেই সফর পিছিয়েছে কমিশন। সিইও মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোটার তালিকা প্রকাশ, ১ মার্চ ইডেনে ক্রিকেট ম্যাচ এবং চলতি সিবিএসই ও আইসিএসই পরীক্ষার কারণে এই সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি ৩ মার্চ দোলযাত্রার উৎসবও রয়েছে। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে। তবে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’র কাজ শেষ না হলে ধারাবাহিক তালিকা প্রকাশ করা যাবে। এই ডামাডোলের মধ্যেই বুথবিন্যাসের পরিকল্পনা বাতিল করে পুরনো ৮০,৬৮১টি বুথই বহাল রাখা হয়েছে। এদিনের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মানবিক কর্মসূচিও পালন করেন। পথ দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবারের ২১ জন সদস্যের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার টাকা ভাতার বিনিময়ে কাজে যোগ দিলেও পরে তাঁদের গ্রুপ-ডি পদে স্থায়ী করার প্রতিশ্রুতি দেন। জৈন সম্প্রদায়ের মন্দির নির্মাণের আবেদন প্রসঙ্গে তিনি পরামর্শ দেন, একটি ট্রাস্ট গঠন করলে সরকার জমি দিয়ে সবরকম সাহায্য করবে। শেষে আগামী ২ মার্চ নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে দোল উৎসবের বড়সড় আয়োজনের ঘোষণা করে জনসংযোগের কাজও সেরে রাখেন মমতা।