তনয় কুমার মিশ্র, নয়া জামানা,মালদা: মহরম এলেই এক সময় মালদা জেলার গ্রামবাংলা মুখরিত হয়ে উঠত ঝাড়নি-মার্সিয়া গানের সুরে। কারবালার শোকগাঁথাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন লোকসংগীত ছিল জেলার মুসলিম সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাবে এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে আজ সেই ঐতিহ্য ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে ঝাড়নি গানকে বাঁচিয়ে রাখতে বিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছেন মালদার লোকশিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।লোকশিল্পীদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই কারবালার ইতিহাস, ইমাম হাসান-হোসেনের আত্মত্যাগ কিংবা ঝাড়নি গানের উৎপত্তি সম্পর্কে অবগত নন। অথচ এক সময় মহরম উপলক্ষে টানা এক মাস ধরে জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঝাড়নি গানের আসর বসত। শিল্পীদের যথেষ্ট সামাজিক মর্যাদাও ছিল। বর্তমানে সেই পরিবেশ আর নেই।’কারবালার মাঝারে মাতা, দেখে নিজের নজরে / রক্ত মেখে হোসেন আমার, পড়ে আছে কাতরে’— এমন অসংখ্য করুণ পংক্তিতে ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরা হয় ঝাড়নি-মার্সিয়া গানে। মূলত বাঁশ কেটে ঝাঁটার মতো তৈরি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র ‘ঝাড়নি’ ব্যবহার করে এই গান পরিবেশন করা হয় বলেই এর নাম ‘ঝাড়নি গান’।লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, মধ্যযুগে কবি মুহম্মদ খানের ‘মকতুল হোসেন’ কাব্য থেকেই বাংলায় এই ধারার সূচনা। পরবর্তীকালে জহরনামা, সাদ্দাদের জারি, শাহজালালের জারি, সোহরাব-রোস্তমের জারিসহ নানা কাহিনি যুক্ত হয়ে এটি বাংলার লোকগানের এক শক্তিশালী শাখায় পরিণত হয়।এক সময় পঞ্চানন্দপুরের কিসমতটোলা, লস্করিটোলা, আলাদিটোলা, জানুটোলাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঝাড়নি গানের জন্য সুপরিচিত ছিল। জেলার নানা প্রান্ত থেকে শিল্পীদের ডাক পড়ত মহরমের অনুষ্ঠানে। বর্তমানে বহু প্রবীণ শিল্পী আর বেঁচে নেই। ফলে ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব এসে পড়েছে নতুন প্রজন্মের কাঁধে।এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিসমতটোলা, লস্করিটোলা ও সংলগ্ন এলাকার একদল তরুণ প্রতিবছর মহরমের আগে নিয়মিত মহড়া দেন। কারবালার শোকগাথা নিয়ে পরিবেশিত হয় ঝাড়নি-মার্সিয়া। মহরম উপলক্ষে প্রায় চল্লিশ দিন ধরে বিভিন্ন গ্রামে প্রতিযোগিতা ও আসরেরও আয়োজন করা হয়।
বর্তমানে এই ঐতিহ্য রক্ষায় সক্রিয় রয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষক, লেখক ও শিল্পী টনিক আখতার, লেখক ও শিল্পী মইনুল আজিজ, আব্দুল খালেক, আলিম শেখ, মুস্তাক আহমেদ, হাসেন শেখ, সাইফুদ্দিন শেখ, আবুল হোসেন, বারকাত আলি-সহ একাধিক শিল্পী। তবে প্রবীণ শিল্পীদের মৃত্যুর ফলে অনেক এলাকায় এই গানের চর্চা কমে এসেছে।ঝাড়নি শিল্পী ও লেখক টনিক আখতার বলেন, আমরা ছোটবেলায় বাপ-ঠাকুর্দাদের মুখে এই গান শুনে বড় হয়েছি। এখন অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। তবুও এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে দিতে চাই না। আগামী দিনে বিদ্যালয় ও কলেজের পাঠ্যসূচিতে ঝাড়নি গান অন্তর্ভুক্ত করা হলে নতুন প্রজন্ম এই লোকসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবে।রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষক তানিয়ার রহমান বলেন, মহরমের মূল সুরই হলো শোক ও মানবিকতার শিক্ষা। ঝাড়নি গান সেই শোককে এক অনন্য লোকায়ত শিল্পরূপে প্রকাশ করে। এই গান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও এক উজ্জ্বল নিদর্শন। বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক শিক্ষার অংশ হিসেবে ঝাড়নি গান অন্তর্ভুক্ত করা গেলে এই ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।লোকসংগীত গবেষক ও গম্ভীরা শিল্পী বাবলু মণ্ডল বলেন,গ্রামীণ সমাজের বহু লোকশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। ঝাড়নি গান তার অন্যতম। শুধু মহরম নয়, সারা বছর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও এই শিল্পকে মর্যাদা দিতে হবে। শিল্পীদের আর্থিক ও সামাজিক স্বীকৃতি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি পাঠ্যসূচিতে স্থান পেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণের আগ্রহ তৈরি হবে।লোকশিল্পীদের দাবি, ঝাড়নি শিল্পীদের সরকারি তালিকা প্রস্তুত, আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত কর্মশালা, সাংস্কৃতিক উৎসবে অগ্রাধিকার এবং বিদ্যালয়-কলেজের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মালদার এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। মহরমের আবহে সেই দাবিই আজ আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
একূল-ওকূল হারিয়ে অকূল পাথারে সেলিম, শূন্যের গেরো কাটাতে এবার মিম-ই কি ভরসা?