নয়া জামানা ডেস্ক : ঘরের মাঠ ভবানীপুরে শনিবার মেজাজ হারালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচারের ময়দানে মাইক-সংঘাতের জেরে রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে মাঝপথেই সভামঞ্চ ছাড়লেন তৃণমূলনেত্রী। চড়া সুরে বিজেপি-র বিরুদ্ধে ‘অসভ্যতা’ ও ‘অপমানের’ অভিযোগ তুলে সরব হলেন তিনি। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিঘ্নিত করে এমন পরিস্থিতিতে বক্তব্য রাখা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তবে পিছু হটার পাত্রী তিনি নন, ভোটেই এই অপমানের বদলা নেওয়ার ডাক দিয়েছেন মমতা।
শনিবার ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া রোডে জনসভা ছিল মমতার। অভিযোগ, তাঁর সভার খুব কাছেই বিজেপি মাইকিং শুরু করে। এতেই তৈরি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। ক্ষুব্ধ মমতা বলেন, ‘আমি এই অসভ্যতামি করতে পারব না, এটা খুব অপমানের’! তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশনের সমস্ত অফিশিয়াল অনুমতি নিয়ে তিনি সভা করতে এসেছেন। তা সত্ত্বেও বিজেপি ইচ্ছে করে তাঁর সভায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, ‘কেন করবে এটা? ইলেকশনের কতগুলো রুলস আছে। তা হলে ওরাও যেদিন মিটিং করবে তোমরা পাল্টা লাগিয়ে দেবে। তখন পুলিশ তুলতে আসলে, মেয়েদের ধরে এফআইআর করবে। এটা পার্শিয়ালিটি।’ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মঞ্চ থেকেই ফোনে কাউকে নির্দেশ দিতে দেখা যায় তাঁকে। শেষে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি এই অসভ্যতামি করতে পারব না। এটা খুব অপমানজনক। আমি আপনাদের নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি। যদি পারেন, ভোটটা আমায় দেবেন। আমার সিম্বল নম্বর ২। কিন্তু এর প্রতিবাদে আপনাদের ভোটটা দিতে হবে। আমাকে মিটিং পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না।’
ভবানীপুরকে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এ দিন সম্প্রীতির বার্তা দেন মমতা। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গ সব সংস্কৃতিকে সম্মান করতে জানে। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোট করানোর নামে বিজেপি ‘ছাপ্পা ভোট’ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে পাল্টা তোপ দাগেন তিনি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কলকাতাকে ‘ঝুপড়ি’ তকমা দেওয়ার মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে মমতা বলেন, ‘আপনারা বলছেন কলকাতাকে আমি ঝুপড়ি বানিয়ে দিয়েছি। তা হলে কি গরিবেরা থাকবেন না? দোকানদার থাকবেন না? যে আপনার বাড়িতে কাজ করেন, দোকানে কাজ করেন, যাঁরা শ্রমিক, কৃষক, তাঁদের দরকার নেই?’ তাঁর সংযোজন, কোটি কোটি টাকা থাকলেই সব হয় না, সাধারণ মানুষকে সম্মান করা শিখতে হয়।
এ দিন উত্তরপ্রদেশের নারী নির্যাতন প্রসঙ্গ টেনেও বিজেপি-কে আক্রমণ করেন মমতা। দাবি করেন, উত্তরপ্রদেশে অভিযোগ জানাতে বাধা দেওয়া হয়, কিন্তু বাংলায় কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর পরেই আয়কর হানার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটির প্রধান মিরাজের বাড়িতে কেন হানা দেওয়া হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। অভিযোগের সুরে বলেন, ‘কেন? কারণ ও আমার ইনকাম ট্যাক্স কেস করে। আমি তো তখন ভাবিনি ও গুজরাতি না মারোয়াড়ি না রাজস্থানি না বাঙালি? তা হলে কেউ কেউ কেন এটা ভাবে?’ জঙ্গলমহলে বিজেপি ফর্ম পূরণ করিয়ে প্রতারণা করেছে বলেও তাঁর দাবি। তিনি বলেন, ‘কী প্রতারণা করে!’
ভবানীপুরের পর বেহালার চৌরাস্তাতেও আক্রমণাত্মক মেজাজে পাওয়া যায় মমতাকে। বিজেপি-কে বিঁধে তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের আসন কমিয়ে টাকা দিয়ে বিধায়ক কেনাই এখন গেরুয়া শিবিরের লক্ষ্য। মমতা বলেন, ‘ওদের এখন খেলা হচ্ছে, যেমন তেমন করে তৃণমূলের আসনটা কমিয়ে দাও। তা হলে টাকা দিয়ে কিনব, আর তা না হলে ভাঙব। আমি বলি, কোনওটাই হবে না। আমরা ভাঙব তবু মচকাব না। এটা মাথায় রেখে দিও।’ গরমের দিনে মহিলাদের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘সকালে একদিন পান্তা ভাত খেয়ে নেবেন। গরমের দিনে পান্তা ভাত খেলে শরীরটা ভাল থাকে। ওয়েটটাও কমে। কিন্তু ভোটটা সকাল সকাল দিয়ে আসবেন।’
নৌকা বিহার থেকে অনুপ্রবেশ ইস্যু— প্রতিটি বিষয়েই বিজেপি-কে পাল্টা দিয়েছেন মমতা। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিরোধীরা ফেক নিউজ ছড়াচ্ছে বলে দাবি করে মমতা সাফ বলেন, ইউনেস্কো হেরিটেজ তকমা নিয়ে বিরোধীদের হোর্ডিং আসলে ‘অর্ধশিক্ষিত’দের কাজ। তাঁর দাবি, ২০২৫ সাল থেকেই হেরিটেজ নিয়ে আলোচনা চলছে। মমতার দাবি, তৃণমূল ইতিমধ্যেই প্রথম দফায় ‘সেঞ্চুরি’ পার করেছে। মাইক বিভ্রাট থেকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতিসক্রিয়তা— মমতার শনিবাসরীয় প্রচার ছিল আগাগোড়া ঝাঁঝালো ও সোজাসাপ্টা। ছবি সংগৃহিত।