নয়া জামানা ডেস্ক : ‘আমার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা। আমাকে ৫৫ ঘণ্টা জেরা করা হয়েছে। অথচ মমতাজির বিরুদ্ধে মোদীজি একটা মামলাও করেননি কেন?’ শনিবার শ্রীরামপুরের জনসভা থেকে এভাবেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একযোগে তীব্র আক্রমণ করলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, মমতাজির ওপর কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সির খাঁড়া নেমে আসে না কারণ তিনি বিজেপির সঙ্গে সরাসরি লড়াই করেন না। রাহুল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, গোটা দেশে বিজেপি-কে রুখতে পারে একমাত্র কংগ্রেস।
রাহুলের অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদী এবং আরএসএস-এর আসল লক্ষ্য বা শত্রু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন, বরং তাঁদের চক্ষুশূল হল কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধী। তিনি জানান, বিজেপির জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার অপরাধে তাঁর সরকারি বাড়ি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাঁর লোকসভার সদস্যপদ। রাহুল বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা রয়েছে। কখনও ঝাড়খণ্ড, কখনও মহারাষ্ট্র বা বিহারে গেলেও ১০-১৫ দিন অন্তর মামলায় হাজিরা দিতে হয়। মমতাজির বিরুদ্ধে কটা মামলা করেছেন মোদীজি? তাঁকে কত ঘণ্টা জেরা করা হয়েছে? আমাকে টানা পাঁচ দিন ধরে ৫৫ ঘণ্টা জেরা করেছে ইডি। আমি এখন জামিনে আছি বলেই আপনাদের সামনে কথা বলতে পারছি, নয়তো আমাকে এতদিনে জেলেই থাকতে হতো।’ রাহুলের দাবি, মমতাজি সঠিক ভাবে কাজ করলে বা দুর্নীতি না করলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসার কোনও সম্ভাবনা তৈরি হতো না।
মোদীর ‘তথাকথিত’ দেশভক্তি নিয়ে তোপ দেগে রাহুল বলেন, ‘মোদী নিজেকে দেশভক্ত বলে দাবি করেন, কিন্তু ওঁর প্রধান কাজ হল দেশ বিক্রি করা। গত ১০-১২ বছরে তাঁর সরকার গরিবদের জন্য কিছুই করেনি। যা করেছে, সবটাই মুষ্টিমেয় কয়েক জন কোটিপতি বন্ধুর জন্য।’ শ্রীরামপুরের বন্ধ কলকারখানা এবং ধুঁকতে থাকা চটকলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মোদী দেশে নোটবন্দি এবং জিএসটি কার্যকর করে ছোট কারখানা ও শিল্প সব বন্ধ করে দিয়েছেন। রাহুলের পর্যবেক্ষণ, ‘মোদী ভারতে যা করছেন, মমতাজি ঠিক সেই কাজটাই বাংলায় করছেন।’ কর্মসংস্থান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে একহাত নিয়ে রাহুল বলেন, ‘২০২১ সালে ৫ লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মমতা। অথচ আজ বাংলায় ৮৪ লক্ষ যুবক বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। এটাই বাংলার বর্তমান বাস্তব ছবি। এখানে চাকরি পেতে গেলে তৃণমূল নেতার আত্মীয় হতে হয়, নয়তো কাজ মেলে না।’
এদিন শ্রীরামপুর ও মেটিয়াবুরুজের সভা থেকে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরেন রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আসলে নিয়ন্ত্রণ করেন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাহুল বলেন, ‘ট্রাম্পের কাছে দুটি হাতিয়ার রয়েছে। একটি হল এপস্টিন ফাইল। সেখানে মোদীর আসল চরিত্র ও ভাবমূর্তি ধরা পড়েছে। ট্রাম্প জানেন, যে দিন সেই ফাইল তিনি প্রকাশ্যে আনবেন, সে দিন মোদীজি শেষ। লোকসভায় আমি দু-চারটে এই নিয়ে কথা বলতেই প্রধানমন্ত্রী ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।’ রাহুলের দ্বিতীয় অভিযোগটি আদানির আর্থিক নথি সংক্রান্ত। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্পের হাতে আদানির সংস্থার সব গোপন নথি রয়েছে, তাই ট্রাম্প যা বলেন মোদীকে তা-ই করতে হয়। ‘ঝাঁপ মারতে বললে মোদীজি ঝাঁপ মারেন। ইজরায়েল যেতে বললে দুই মিনিটে পৌঁছে যান’— এভাবেই মোদীর বিদেশনীতিকে কটাক্ষ করেন রাহুল।
বাংলার শিল্প পরিস্থিতির অবনতির জন্য সরাসরি বাম ও তৃণমূলকে দায়ী করেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, ‘এখানে আগে হিন্দুস্তান মোটরসে অ্যাম্বাসাডর গাড়ি তৈরি হত। শ্রীরামপুর ছিল শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। সেই শিল্প প্রথমে বামপন্থীরা এবং পরে মমতাজি মিলে শেষ করেছেন।’ তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সারদা, রোজভ্যালির মতো চিটফান্ড কেলেঙ্কারির কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ১৯ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিতে তৃণমূল জড়িত। কয়লা পাচার হোক বা গ্রামগঞ্জের গুন্ডা কর— তৃণমূলের শাসনের ধরুন রাজ্যের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে বলে তিনি দাবি করেন। রাহুলের অভিযোগ, ‘মোদীজি দেশের বাকি অংশে যে হিংসা ছড়ান, এখানে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তৃণমূলের গুন্ডারা সেই একই হিংসা করে। আমাদের কর্মীদের গায়ে হাত দেওয়া হয়।’
রাহুল গান্ধী তাঁর ভাষণে বারবার ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’র কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত চার হাজার কিলোমিটার হেঁটে একটাই বার্তা দিয়েছি— ঘৃণার বাজারে ভালোবাসার দোকান খুলতে হবে। দেশে দুটি বিচারধারার লড়াই চলছে। একদিকে কংগ্রেস, সংবিধান ও ঐক্য; অন্যদিকে বিজেপি, সঙ্ঘ, হিংসা ও অহঙ্কার। মোদীজি যেখানেই যান, সেখানে ধর্ম এবং জাতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন।’ রাহুলের দাবি, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ বা হরিয়ানার মতো রাজ্যে ভোট চুরি করে জেতার চেষ্টা করছে। এসআইআর করে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ‘৫৬ ইঞ্চি’ ছাতির প্রসঙ্গ টেনে রাহুল বলেন, ‘যদি ওঁর সত্যিই ৫৬ ইঞ্চির বুক থাকত, তবে লোকসভা ছেড়ে পালিয়ে যেতেন না। ট্রাম্প প্রকাশ্যে মোদীকে নিয়ে ঠাট্টা করেন, অথচ প্রধানমন্ত্রী একটা শব্দও বলতে পারেন না। কারণ ওঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চাবিকাঠি ট্রাম্পের হাতে বন্দি।’ রাহুলের দাবি, মোদী আমেরিকার সঙ্গে এমন সব চুক্তি করছেন যার ফলে দেশের কৃষি ক্ষেত্র, শক্তি ক্ষেত্র এবং জনগণের ব্যক্তিগত তথ্য বিদেশের হাতে চলে যাচ্ছে। কোনও প্রধানমন্ত্রী চাপের মুখে না পড়লে এমনটা করতে পারেন না বলে তিনি মনে করেন।
মেটিয়াবুরুজের সভা থেকে রাহুল আরও বলেন, ‘বিজেপি এবং আরএসএসের বিরুদ্ধে যে লড়াই করে, তাকেই ওরা আক্রমণ করে। পুরো দেশ জানে আমি সব সময় লড়ছি, তাই ২৪ ঘণ্টা মোদীজি আমাকে আক্রমণ করেন। মমতাজির লোকসভা বা বিধানসভার সদস্যপদ কি ওরা কেড়েছে? কেন কাড়েনি? কারণ ওরা জানে ওদের আসল লড়াই আমার সঙ্গে।’ বাংলার শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলা সবার সামনে ছিল, শিল্পেও এক সময় এই রাজ্য সবার আগে ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে সরকারের অপশাসনে সব শেষ হয়ে গিয়েছে।
শেষবেলায় ভোটারদের কাছে রাহুলের আবেদন, রাজ্যে কংগ্রেসকে মজবুত করতে হবে। তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস নীতির ভিত্তিতে লড়াই করে। শুধু ভোটের সময় এসে মোদীজি মমতাকে কটাক্ষ করেন, কিন্তু ভোট মিটে গেলে সব চুপ। কারণ তাঁরা তলে তলে এক।’ রাহুল গ্যারান্টি দিয়ে বলেন, তিনি মোদীকে ভয় পান না বরং মোদীই কংগ্রেসের এই আদর্শগত লড়াইকে ভয় পান। মেটিয়াবুরুজের জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভোট দিন, বিধানসভায় পাঠান। আমরাই পারব বাংলায় শিল্প ফিরিয়ে আনতে এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে।’ এভাবেই শনিবাসরীয় বিকেলে শ্রীরামপুর ও মেটিয়াবুরুজের সভা থেকে বিজেপি ও তৃণমূলকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে বর্ণনা করলেন রাহুল গান্ধী। ছবি পিটিআই।