আজও অসহায়, অথর্ব মানুষকে বাঁচার প্রেরণা যোগান বাগনানের অগ্নিকন্যা রূপালি
সন্দীপ মজুমদার
হিন্দু বা মুসলিম সকল ধর্মের মানুষদের কাছেই আরাধ্য দেবী হয়ে উঠেছেন এক মহীয়সী নারী। কিন্তু কে তিনি? না, তেমন কোনও বিখ্যাত ব্যক্তি বা কোনও মনীষী নন, দানবীরও নন। অবশ্য তিনি একদা ধনীর দুলালী থাকলেও গ্রহ-বৈগুণ্যে এখন তিনি পথের ভিখারী। তিনি একজন দয়াময়ী নারী। তঁবে স্নেহের পরশে অসহায় মানুষ সহায় পায়, দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষ দিশা ফিরে পায়, অসপৃষ্যের মুখে ফোটে হাসি। তাঁকে ঘিরে পঙ্গু বা দৃষ্টিশক্তিহীন, শ্রবণশক্তি হীন, ভবঘুরেদের মধ্যেও এতো তরঙ্গায়িত আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কিসের এতো আনন্দ-লহরী? যার জন্য এতো আনন্দ, এতো উচ্ছ্বসিত উন্মাদনা, সিন্ধু উচ্ছলিত তরঙ্গমালা? তিনি আর কেউ নন, তিনি সামান্য একজন ভিখারিনী মাত্র! চমকে উঠলেও এটাই সত্যি, বাগনান রেলওয়ে স্টেশন প্ল্যাটফর্মে থাকা এই মহিলাকে একডাকে সকলেই রুপালি সরকার নামে চেনেন। যাঁরা তাঁকে দেখেননি তাঁদের জন্য বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়, এই রুপালিকেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘অগ্নিকন্যা’ সম্মানে ভূষিত করেছেন। তিনি বাগনানের দুঃস্থ, অসহায়, ভবঘুরে, পঙ্গু, দৃষ্টিশক্তিহীন, শ্রবণশক্তি হীন মানুষের ‘অসম্বোধিত মা’। সামান্য এই ভিখারিনী এখন সকলের কাছে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। কিন্তু তাঁর জীবন কাহিনী খুবই বেদনাময়।

জীবনের চব্বিশটি বিবর্ণ বসন্ত বাগনান স্টেশন প্ল্যাটফর্মে ভিক্ষাবৃত্তি করেই অতিবাহিত করেছেন তিনি। শ্যামপুর থানার একটি গ্রামের এক বিত্তশালী ব্যক্তির অতি আদরের দুহিতা ছিলেন রূপালি। তিনি ব্রতচারী নৃত্য, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, কাওয়ালী, কীর্তন সংগীত ইত্যাদিতে পারদর্শী। কিন্তু এতোসব গুণবতী হওয়া সত্ত্বেও বাবা মারা যাওয়ায় কোনও এক কারণে বাড়িতে তাঁর আর স্থান হয়নি। তাই তিনি এক বুক যন্ত্রণা আর অভিমানকে সঙ্গী করে আজ থেকে প্রায় চব্বিশ বছর আগে বাগনান রেলওয়ে স্টেশন প্লাটফর্মে এসে হাজির হন। কিন্তু সেখানে এসে প্লাটফর্মের এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসহায় পঙ্গু, দৃষ্টিশক্তি হীন, ভবঘুরে, শ্রবণশক্তি হীন মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের যন্ত্রণাকে নিজের হৃদয়ের যন্ত্রণা বলে উপলব্ধি করেছিলেন রুপালি। তাদের থেকে যে তিনি অনেক ভাল রয়েছেন সেই কথা অনুভব করে সেদিন তিনি মনে মনে ঈশ্বরকে তাঁর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। দূর হয়েছিল তাঁর বুকের বেদনা, দূর হয়েছিল তাঁর অভিমান। তাই প্লাটফর্মের এইসব অসহায় মানুষগুলোকে ছেড়ে রুপালির আর অন্য কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

তখন থেকেই শুরু হয় নিষ্ঠুর সমাজের সঙ্গে তাঁর অসম সংগ্রাম। তখন থেকেই তিনি ভিক্ষার ঝুলি হাতে তুলে নেন। রাত-দিন এক করে তিনি ভিক্ষা করতে শুরু করেন। আর ভিক্ষা-অর্জিত অর্থ দিয়ে অসহায় মানুষগুলোর মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন রুপালি। তাছাড়াও কারও জামা বা কাপড় অথবা জুতো না থাকলে সেগুলোর অভাবও পূরণ করেছেন রুপালি। অথচ নিজের জন্য প্রায় কিছুই রাখেনন না তিনি। তাঁর খাওয়াও যৎ সামান্য। রূপালি সকলকে সঙ্গে নিয়ে ভাতৃদ্বিতীয়া অথবা রাখি বন্ধন পালন করেন। বাদ যায়না রেলযাত্রীরাও। এই দিনগুলিতে প্রত্যেককে তিনি মিষ্টিমুখও করান। দুর্গা পুজো বা ঈদের সময় তিনি হিন্দু বা মুসলিম বাড়িতে তাঁর প্ল্যাটফর্ম-সংসারের সদস্যদের নিয়ে যান। শুধু তাই নয়, এইসব অসহায় মানুষদেরকে সঙ্গে নিয়ে কখনও পুরী, কখনও মায়াপুর-নবদ্বীপ, আবার কখনও হরিদ্বার ভ্রমণ করেছেন তিনি।

এখন রুপালির প্ল্যাটফর্ম-সংসারে প্রায় ৬০ জন অসহায় ভবঘুরে, জরাগ্রস্থ মানুষ রয়েছেন। বেশ কয়েক বছর পূর্বে বাগনান-১ নম্বর ব্লকের তৎকালীন বিডিও ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য নিজে উদ্যোগী হয়ে ভোটার তালিকায় ও আধার কার্ডে রূপালির নাম সংযোজিত করেছেন। রুপালি সহ আরও ৪০ জনকে তিনি ‘সহায়’ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করে তাঁদের দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থাও করেন। ইন্দ্রানীদেবী বাগনান রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত হয়ে নিজের হাতে তাঁদের খাবার পরিবেশনও করেন। তার আগে বাগনান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভাস্কর চন্দ্র আদক বিদ্যালয়ের মিড ডে মিলের উদ্বৃত্ত খাবার রূপালিকে দিয়ে দিতেন। রুপালি সেই খাবার নিয়ে প্লাটফর্মের সকল অসহায় মানুষদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন। এই সময় বেশ কিছু অসাধু ব্যক্তি রুপালির কাছ থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে যেত বলেও অভিযোগ উঠেছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমাজ কল্যাণ দপ্তর ও পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কমিশনের পক্ষ থেকে ২০১৮ সালের ৩ আগস্ট কলকাতার অহীন্দ্র মঞ্চে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন নারী ও শিশু কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী শশী পাঁজা রুপালির হাতে অগ্নিকন্যা সম্মান সম্বলিত স্মারক তুলে দেন। রুপালি অনেককেই পিতলের দেব-দেবীর মূর্তি উপহার স্বরূপ প্রদান করেছেন। বাগনানের বহু বাড়িতেই তাঁর উপহার দেওয়া বিভিন্ন দেব-দেবীর পিতলের মূর্তি পূজিত হয়।

তিনি সকলের অলক্ষে তাঁর ভিক্ষালব্ধ অর্থ কয়েকটি ধর্মীয় ও সেবা প্রতিষ্ঠানকেও দান করে থাকেন। বেশ কিছু মানুষ তাঁর পাশে থাকলেও সুযোগ সন্ধানী কিছু অসাধু ব্যক্তি এবং বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এইরকম একজন মহীয়সী নারীর সঙ্গে প্রতারণা করতেও দ্বিধাবোধ করে না। দীর্ঘ প্রায় চব্বিশ বছর রেলওয়ে প্লাটফর্মে পড়ে থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে করতে বেশ কয়েকটি অসুখ বাসা বেঁধেছে রুপালির শরীরে। বাগনান-১ নম্বর ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ ইন্দ্রনীল মিত্র বাগনানে থাকাকালীন তাঁর কাজের সময় বাঁচিয়ে নিয়মিতভাবে রূপালির চিকিৎসা করতেন। এখনও তিনি বাগনানে এলে রূপালীর চিকিৎসা করে থাকেন। গত বছর এক পথ দুর্ঘটনায় রুপালির একটি পা খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল। তখন রুপালি চার মাস যাবৎ পুরোপুরি ভাবে রাস্তার পাশে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। সেই সময় কিছু সহৃদ ব্যক্তির সাহচর্যে রূপালি সুস্থ হয়ে ওঠেন। বাগনানের এই ‘অন্নপূর্ণা’কে সচক্ষে দেখার জন্য অনেকেই বাগনান রেলওয়ে স্টেশনের ১- নম্বর প্লাটফর্মে আসেন এবং রুপালির সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করে যান। রুপালি তাঁর সহজাত মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে সকলকে আপন করে নেন। কেউ কেউ তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি বাগনান প্লাটফর্মে পড়ে থাকা অসহায় মানুষদের কথা ভেবে সমস্ত প্রস্তাব হাসিমুখে ফিরিয়ে দিয়েছেন। বাগনান রেলওয়ে স্টেশন এখন রুপালির কাছে ‘যৌবনের উপবন’ আর ‘বার্ধক্যের বারাণসী’ হয়েই রয়ে গিয়েছে।