নয়া জামানা, কলকাতা : ভোটের ফল ঘোষণা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু তার আগেই বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার মতো এক বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে এখন তোলপাড় কংগ্রেসের অন্দরমহল। এআইসিসি নেতা তথা বাংলার পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীর কার্যত ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, বাংলায় ফের ক্ষমতায় আসছে তৃণমূল কংগ্রেসই। ভোট গণনার আগে দলেরই এক শীর্ষ নেতার এমন ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ প্রদেশ কংগ্রেসের নেতাদের কাছে কেবল অস্বস্তিকর নয়, রীতিমতো অপমানেরও। যেখানে ২৯৪টি আসনে ‘একলা চলো’ নীতি নিয়ে জানপ্রাণ লড়িয়েছেন কর্মীরা, সেখানে মীরের এই মন্তব্য কার্যত দলের লড়াইকে গুরুত্বহীন করে দিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব সরাসরি দিল্লির এই নেতার বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন। রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে রাহুল গান্ধী বিজেপি এবং তৃণমূল—উভয় পক্ষকেই তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। সারদা-নারদা থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা, কোনও কিছুতেই শাসক দলকে ছাড় দেননি তিনি। সেই কড়া অবস্থান ও লড়াইয়ের মেজাজ যখন তুঙ্গে, তখনই মীর দাবি করলেন যে বাংলায় বিজেপির সরকার গঠনের কোনও সম্ভাবনা নেই এবং তৃণমূলই আবার ক্ষমতায় ফিরবে। পর্যবেক্ষকের এই দাবি কংগ্রেসের অন্দরে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। কর্মীরা ভাবছেন, যদি তৃণমূলই জেতে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব তা মেনে নেয়, তবে কংগ্রেসের এই একক লড়াইয়ের মানে কী?
এই ইস্যুতে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীররঞ্জন চৌধুরী। নাম না করেই তিনি বিঁধেছেন মীরকে। অধীর বলেন, ‘কিছু নেতা এমন মনোভাব প্রকাশ করছেন, যেন তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করলে ভালো হতো ।’ অধীরের এই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে দলের কর্মীদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যেখানে কংগ্রেস কর্মীরা শাসক দলের হাতে নিগৃহীত হচ্ছেন, সেখানে নেতাদের মুখে এমন তৃণমূল-বন্দনা মেনে নেওয়া যায় না। অধীরের এই অবস্থান দলের অন্দরে তৈরি হওয়া ফাটলকেই স্পষ্ট করে দিল। দলের শৃঙ্খলা রক্ষা এখন রাজ্য নেতৃত্বের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোট মিটলেও কংগ্রেস কর্মীদের উপর হামলা কমেনি বলে অভিযোগ। মুর্শিদাবাদ থেকে শুরু করে কলকাতার রাসবিহারী—সর্বত্রই কংগ্রেস কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার খবর মিলছে। দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর থেকে শুরু করে সমর্থকদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে শাসক দলের বিরুদ্ধে। রাসবিহারী কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় এই নিয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, কংগ্রেসকে দমিয়ে রাখতেই এই পরিকল্পিত সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। এই চরম ডামাডোলের মধ্যে গুলাম আহমেদ মীরের মন্তব্য যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে দিয়েছে। একদিকে কর্মীরা লড়াই করছেন, অন্যদিকে শীর্ষ নেতা জয়ী ঘোষণা করছেন প্রতিপক্ষকে।
এই অদ্ভুত দ্বন্দ্বে এখন বিপর্যস্ত বিধান ভবন। মীরের মন্তব্যের ফলে সাধারণ ভোটারদের কাছেও ভুল বার্তা যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক জেলা নেতৃত্ব। যদি দল নিজেদের একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতেই ব্যর্থ হয়, তবে আগামী দিনে জনভিত্তি আরও দুর্বল হওয়ার ভয় থাকছে। একলা লড়াইয়ের রণকৌশল কি তবে শুরুতেই হোঁচট খেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই এখন হিমশিম খাচ্ছে প্রদেশ কংগ্রেস। বাইরে যখন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই তুঙ্গে, তখন ঘরের অন্দরের এই মতভেদ দলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ফল প্রকাশের আগে এই অস্বস্তি কংগ্রেসের জন্য কতটা কাল হয়ে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। রাজনৈতিক মহলের নজর এখন মীরের মন্তব্যের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায়। সব মিলিয়ে ফল ঘোষণার আগেই হাত শিবিরে পরাজয়ের সুর কি তবে দিল্লির নির্দেশে? প্রশ্নটা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
‘শীত–গ্রীষ্ম–বর্ষা, তৃণমূলই ভরসা’, আলিপুরদুয়ারে বজ্রকণ্ঠে বিজেপির বিরুদ্ধে আগুন ঝরালেন মমতা