নয়া জামানা ডেস্ক : বুথফেরত সমীক্ষাকে ‘শেয়ার বাজারের কারসাজি’ বলে উড়িয়ে দিয়ে রাজ্যে ফের ২০০-র বেশি আসনে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের প্রাক্কালে শনিবার দলের কাউন্টিং এজেন্ট ও প্রার্থীদের নিয়ে দীর্ঘ ভার্চুয়াল বৈঠক করেন তৃণমূল নেত্রী এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকেই দলীয় কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে মমতা ঘোষণা করেন, ‘কেন্দ্রীয় বাহিনীর অত্যাচার যাঁরা সয়েছেন, তাঁরা পুরস্কৃত হবেন’। বুথফেরত সমীক্ষায় বিজেপিকে এগিয়ে রাখা স্রেফ একটি কৌশল বলে দাবি করে কর্মীদের গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঠ না ছাড়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। শনিবারের এই বৈঠকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে রীতিমতো গর্জে ওঠেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, ভোট চলাকালীন কেন্দ্রীয় বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম চালিয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানান, যে সমস্ত কর্মী ও সাধারণ মানুষ বাহিনীর এই ‘অত্যাচার’ সহ্য করেও দলের পাশে দাঁড়িয়েছেন, দল তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি দেবে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই সুরে আক্রমণ শানান। তিনি দাবি করেন, বিজেপি নিজেও জানে তারা সরকার গড়তে পারবে না। তাই ভুয়ো সমীক্ষা দেখিয়ে আর্থিক জালিয়াতি করা হয়েছে। অভিষেকের ভবিষ্যদ্বাণী, ‘২০২১-এর চেয়েও এ বারের নির্বাচনে বেশি আসন পাবে দল’। গণনার দিন ঠিক কী কী করণীয়, তার একটি রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এজেন্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সোমবার ভোরেই তাঁদের গণনাকেন্দ্রে পৌঁছে যেতে হবে। প্রতিটি মুহূর্তের আপডেট পাঠাতে হবে দলের সদর দফতরে। যদি দেখা যায় কোনও কেন্দ্রে খুব কম ব্যবধানে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে, তবে তৎক্ষণাৎ ‘পুনর্গণনার আর্জি’ জানাতে হবে। জয়ের শংসাপত্র হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কোনওভাবেই গণনাকেন্দ্র ত্যাগ করা যাবে না। এমনকি কেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময়ও নিরাপত্তার খাতিরে দলবদ্ধভাবে বেরোনোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নজরদারির জন্য প্রতিটি জেলায় আলাদা পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে তৃণমূল। এই বৈঠকেই কালীঘাট থানার সাসপেন্ড হওয়া ওসি গৌতম দাসকে নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমাজমাধ্যমে বন্দুক হাতে ছবি পোস্ট করায় তাঁকে লালবাজার সাসপেন্ড করলেও মমতা এই শাস্তির পিছনে অন্য কারণ তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘মহিলা এবং শিশুদের মেরেছিলেন কালীঘাটের ওসি’। সেই কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত ভিন রাজ্যের পর্যবেক্ষকদেরও হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সাফ জানান, ৪ মে-র পর উত্তরপ্রদেশ বা অন্য রাজ্যে পালিয়ে গিয়েও লাভ হবে না। মমতার কথায়, ‘প্রত্যেককে আদালতে টেনে আনা হবে অসাংবিধানিক কাজে মদত দেওয়ার জন্য’। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিশানায় ছিলেন কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবারের পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মার সঙ্গে তৃণমূলের যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, তা এই বৈঠকে ছায়া ফেলে। অভিষেক অভিযোগ করেন, বিজেপিই আসলে নির্বাচন কমিশন হিসেবে কাজ করেছে। স্থানীয় স্তরে প্রশাসন ও বাহিনীকে ব্যবহার করে ভোটারদের ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মানুষের রায় তৃণমূলের পক্ষেই যাবে বলে তিনি নিশ্চিত। অভিষেকের হুঁশিয়ারি, অসাংবিধানিক পথে চলা প্রত্যেক আধিকারিকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হবে বলে কর্মীদের আশ্বস্ত করেছেন মমতা। তিনি জানান, সেবারও বুথফেরত সমীক্ষায় বিজেপিকে জেতানো হয়েছিল, কিন্তু ফল হয়েছিল উল্টো। এবারও সেই একই ‘পন্থা’ নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর দাবি। কর্মীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, গণনা কেন্দ্রে বিজেপির কোনও চাপের মুখে মাথা নত করা চলবে না। বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তাই ছিল এ দিনের বৈঠকের মূল নির্যাস। তৃণমূল নেতৃত্বের এই আত্মবিশ্বাসী সুর এবং পুলিশ-প্রশাসনের একাংশের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি গণনার আগের রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিষেক বলেন, সব ধরনের শক্তি প্রয়োগ করেও বিজেপি এবার হারবে। তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই তাঁদের ২০০-র গণ্ডি পার করে দেবে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কথিত অত্যাচারের বিরুদ্ধে তৃণমূলের এই কড়া অবস্থান আদতে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের শেষ মুহূর্তের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করার কৌশল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। এখন দেখার, ৪ জুন ইভিএম খোলার পর মমতা-অভিষেকের এই ভবিষ্যদ্বাণী কতটা সফল হয়। তৃণমূল সূত্রের খবর, বৈঠকের শুরুতেই কর্মীদের ‘আপসহীন লড়াইয়ের’ জন্য অভিনন্দন জানান তৃণমূল নেত্রী। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোটারদের ভয় দেখানোর সব চেষ্টাই ব্যর্থ হবে। অভিষেকের দাবি, ‘বিজেপিও সরকার গঠনের আশা করছে না’। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, কেবল মাত্র সেন্টিমেন্ট তৈরি করতেই এই সব সমীক্ষা সামনে আনা হয়েছে। গণনাকেন্দ্রে এজেন্টদের কোনোভাবেই ভয় পেলে চলবে না। কোনো প্ররোচনা বা কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাপট দেখে পিছু না হটার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বিজয়ী প্রার্থীরা শংসাপত্র না নেওয়া পর্যন্ত যেন কেউ বাইরে না আসে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। মমতা বলেন, ‘পর্যবেক্ষক, পুলিশ পর্যবেক্ষকেরা ভাবছেন, ৪ মে-র পরে উত্তরপ্রদেশ বা যে রাজ্য থেকে এসেছিলেন, সেখানে পালিয়ে যাবেন! তাঁদের প্রত্যেককে আদালতে টেনে আনা হবে।’ এই কড়া বার্তার মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী আধিকারিকদের নিরপেক্ষ থাকার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন। তৃণমূলের এই উচ্চকিত অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তারা বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফলকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। বরং নিজেদের সংগঠনকে চাঙ্গা রেখে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই জারি রাখতে চাইছে। সব মিলিয়ে শনিবাসরীয় এই ভার্চুয়াল বৈঠক ছিল তৃণমূল কর্মীদের জন্য এক চূড়ান্ত যুদ্ধঘোষণা। যেখানে মমতা ও অভিষেক দুজনেই বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।