নয়া জামানা ডেস্ক : ভোট গণনার টেবিলে কারা বসবেন? কেন্দ্রীয় না রাজ্য সরকারি কর্মী? এই টানাপড়েন পৌঁছেছিল দেশের শীর্ষ আদালত পর্যন্ত। শনিবার সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের ১৩ এপ্রিলের বিজ্ঞপ্তিকে মান্যতা দিয়ে তৃণমূলের আর্জি খারিজ করে দিয়েছে। তবে আইনি লড়াইয়ে হার মানতে নারাজ তৃণমূলের আইনজীবী কপিল সিব্বল। তাঁর দাবি, আদালতের নির্দেশের ‘ভুল ব্যাখ্যা’ করা হচ্ছে। সিব্বলের যুক্তি, তাঁদের আর্জি আদতে খারিজ হয়নি, বরং আদালত কমিশনকে নিজেদের বিজ্ঞপ্তিই অক্ষরে অক্ষরে পালনের নির্দেশ দিয়েছে। শনিবার বিচারপতি পিএস নরসিংহ এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর অবকাশকালীন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ভোট গণনার কাজে নিযুক্ত কাউন্টিং সুপারভাইজার এবং কাউন্টিং অ্যাসিস্ট্যান্ট কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী হতে পারেন, আবার রাজ্য সরকারেরও হতে পারেন। কমিশনের এই সিদ্ধান্তে আইনি কোনও বাধা দেখছে না আদালত। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি কর্মীদের আলাদা করে দেখার মধ্যে একটি মৌলিক ভ্রান্তি রয়েছে। দিনশেষে তাঁরা সকলেই সরকারি কর্মচারী। শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশের পর তৃণমূলের অন্দরে শোরগোল শুরু হলেও সিব্বল দাবি করেছেন, তাঁরা বিজ্ঞপ্তি বাতিল নয়, বরং তার সঠিক বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। তৃণমূলের মূল আপত্তি ছিল গণনা কেন্দ্রে মাইক্রো অবজার্ভারদের পাশাপাশি কাউন্টিং সুপারভাইজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট পদেও শুধু কেন্দ্রীয় কর্মীদের নিয়োগ করা নিয়ে। হাই কোর্টে ধাক্কা খাওয়ার পর মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়। শুনানিতে কপিল সিব্বল সওয়াল করেন, ‘১৩ এপ্রিল জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছে নোটিস জারি করা হলেও আমরা সেটা জানতে পারি ২৯ তারিখে। কমিশন অভিযোগ করছে যে বুথে অশান্তি হতে পারে। কিন্তু এই আশঙ্কার উৎস কী? এটি সরাসরি রাজ্য সরকারের দিকে আঙুল তুলছে।’ সিব্বলের প্রশ্ন ছিল, গণনার প্রতি টেবিলে যদি একজন করে কেন্দ্রীয় মাইক্রো অবজার্ভার থাকেনই, তবে ফের কেন বাড়তি কেন্দ্রীয় কর্মীর প্রয়োজন? কমিশনের পক্ষে আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু পাল্টা যুক্তি দেন যে, গণনায় রিটার্নিং অফিসারের হাতেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে এবং তিনি মূলত রাজ্য ক্যাডারেরই আধিকারিক। পাশাপাশি প্রতিটি প্রার্থীর নিজস্ব কাউন্টিং এজেন্টরাও উপস্থিত থাকেন। ফলে কারচুপির আশঙ্কা ভিত্তিহীন। দু’পক্ষের সওয়াল শোনার পর বিচারপতি বাগচী মন্তব্য করেন, ‘কমিশন সিদ্ধান্ত নিতেই পারে দু’জনই কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী থাকবেন। এতে কোনও নিয়ম ভঙ্গ হচ্ছে না।’ শীর্ষ আদালত সাফ জানায়, গণনা সংক্রান্ত এই মামলায় এখনই নতুন কোনও নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই। কমিশন তার জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে কপিল সিব্বল অবশ্য নতুন ব্যাখ্যার পথ ধরেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিজ্ঞপ্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হলেও পরে আমরা সেটির সঠিক বাস্তবায়নের দাবি তুলেছিলাম। ১৩ এপ্রিলের বিজ্ঞপ্তিতেই বলা হয়েছে যে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য উভয় সরকারের প্রতিনিধিই নিয়োগ করা যেতে পারে। সুপ্রিম কোর্টও সেই নির্দেশই দিয়েছে যে কমিশন যেন নিজেদের বিজ্ঞপ্তির মূল ভাবনা অনুযায়ী চলে।’ অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি নিয়োগ করলে একই পদ্ধতিতে রাজ্যের প্রতিনিধিকেও রাখতে হবে— সিব্বলের দাবি অনুযায়ী আদালত এটাই নিশ্চিত করেছে। মামলা খারিজ হলেও তৃণমূলের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, তারা আশা করছে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ভোটগণনার প্রক্রিয়া স্বাধীন, স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ হবে। বিজ্ঞপ্তির এক নম্বর ধারা এবং দ্বিতীয় পৃষ্ঠার বিশেষ বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে পড়লে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় উভয় কর্মীদের নিয়োগের বিধানই স্পষ্ট হয় বলে দাবি শাসকদলের। তবে আদালতের রায়ে কমিশনের হাত শক্ত হওয়ায় আপাতত গণনাকর্মী নিয়োগে বড় কোনও বাধা রইল না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। হাইকোর্ট আগেই জানিয়েছিল, কেন্দ্রীয় কর্মচারী নিয়োগ বৈধ এবং অভিযোগগুলি তথ্যহীন। সেই ধারা বজায় রইল শীর্ষ আদালতেও। সুপ্রিম কোর্টের মতে, গণনায় কারচুপি হলে ভবিষ্যতে ইলেকশন পিটিশনের মাধ্যমে তা চ্যালেঞ্জ করার পথ খোলাই থাকছে। তৃণমূলের আইনজীবীদের দাবি ছিল, ১৩ এপ্রিলের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনিয়ম বা কারচুপির অভিযোগ এসেছে বলেই কেন্দ্রীয় কর্মী নিয়োগ করতে চায় কমিশন। কিন্তু ওই বিজ্ঞপ্তিরই অন্য অংশে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় উভয় প্রকার কর্মী নিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে। সিব্বল বলেন, ‘আমরা আদালতকে জানিয়েছিলাম, কমিশন চাইলে কেন্দ্রীয় কর্মী নিয়োগ করতেই পারে, কিন্তু একই পদ্ধতিতে রাজ্যের একজন প্রতিনিধিকেও রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট কমিশনের ওই বিজ্ঞপ্তি অক্ষরে অক্ষরে পালনের কথাই বলেছে।’ যদিও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে অন্য সুর। বিচারপতিরা সাফ জানিয়েছেন, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর্মীদের মধ্যে ভেদাভেদ করা অমূলক। কমিশন যদি মনে করে নির্দিষ্ট কোনও গণনা কেন্দ্রে শুধু কেন্দ্রীয় কর্মী রাখবে, তবে তাতে কোনো আইনি ত্রুটি নেই। তৃণমূলের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, কর্মী বাছাই প্রক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল র্যান্ডম বা এলোমেলোভাবে। কিন্তু আদালত সেই তত্ত্বে বিশেষ আমল দেয়নি। বরং বলা হয়েছে, নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিশনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কলকাতা হাই কোর্ট আগেই জানিয়েছিল যে কমিশনের সিদ্ধান্তে বেআইনি কিছু নেই। সেই একই সুর ধ্বনিত হলো শীর্ষ আদালতেও। বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের পূর্বতন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মামলাকারীর অভিযোগগুলো ছিল মূলত প্রমাণহীন এবং আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কমিশনের বিজ্ঞপ্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই বলেই মনে করছে আইন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে, গণনাকর্মী নিয়োগের এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় এসে কমিশনের পক্ষেই রায় দিল। এখন দেখার, সিব্বলের এই নতুন ‘বাস্তবায়ন’ তত্ত্বের পর কমিশন আগামী দিনে তাদের কর্মী নিয়োগের তালিকায় রাজ্য সরকারি কর্মীদের কতটা জায়গা দেয়। তৃণমূলের পক্ষ থেকে জারি করা বিবৃতিতে শীর্ষ আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্বচ্ছ গণনার আশা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, সিব্বল যাই দাবি করুন না কেন, আইনি লড়াইয়ে আপাতত স্বস্তিতে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনই।