নয়া জামানা, কলকাতা : সোমবার রাজ্যের ভাগ্যপরীক্ষা। তার আগে নিরাপত্তার বজ্রবাঁধনে মুড়ে ফেলা হচ্ছে কলকাতাকে। নেতাজি ইন্ডোর থেকে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল— শহরের সাতটি গণনাকেন্দ্রের ২০০ মিটার এলাকার মধ্যে ১৬৩ ধারা জারি করল লালবাজার। সোমবার ভোর ৫টা থেকেই এই নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে। সাফ জানানো হয়েছে, এই সীমানার মধ্যে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত মানেই তা ‘বেআইনি’ বলে গণ্য হবে। কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, নির্দেশ অমান্য করলে আইনি পদক্ষেপ অনিবার্য। শুধু শহর নয়, রাজ্যের সব প্রান্তের গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তা এখন নিশ্ছিদ্র করা হচ্ছে। জেলাতেও ১৬৩ ধারা জারি হতে পারে। কলকাতার সাতটি কেন্দ্র— নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম, হেস্টিংস হাউস কমপ্লেক্স, এপিসি রায় পলিটেকনিক কলেজ, সেন্ট টমাস বয়েজ স্কুল, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল এবং বাবা সাহেব অম্বেডকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটি এখন দুর্গের চেহারা নিয়েছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘আইনসম্মত ভাবে নিযুক্ত কোনও ব্যক্তিকে বাধা, কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর মতো পরিস্থিতি এড়াতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যে কোনও হামলা প্রতিরোধ করতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারার অধীন নির্দেশিকা জারি করা প্রয়োজন রয়েছে।’ গণনাকেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে কোনও মিছিল, সমাবেশ বা বিক্ষোভ প্রদর্শন করা যাবে না। সঙ্গে রাখা যাবে না লাঠি, ধারালো অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র, পাথর কিংবা দাহ্য পদার্থ। আতশবাজি ফাটানো বা কোনো বিস্ফোরক নিয়ে আসাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।গণনাকেন্দ্রের বাইরে ১০০ মিটার পর্যন্ত নো-ভেহিকল জ়োন করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনও সাধারণ গাড়ি সেখানে ঢুকতে পারবে না। সশস্ত্র রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরদারিতে তৈরি হয়েছে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়। স্ট্রংরুমের পাহারায় মোতায়েন করা হয়েছে ২০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রয়োজনে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।প্রতিটি স্ট্রংরুমের জন্য অন্তত ২৪ জন জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। সোমবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে কাউন্টিং। প্রথমে পোস্টাল ব্যালট এবং পরে ইভিএম খোলা হবে। সাধারণত ১৪টি টেবিলে এক রাউন্ড গণনা সম্পন্ন হবে। প্রতিটি কন্ট্রোল ইউনিটের সিল এবং ট্যাগ ঠিক আছে কি না, তা প্রার্থী বা তাঁদের এজেন্টদের সামনে পরীক্ষা করে দেখা হবে। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, স্ট্রংরুম খোলা থেকে শুরু করে ইভিএম আনা এবং ফল ঘোষণা— গোটা প্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফি করা বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট গণনাকক্ষে রিটার্নিং অফিসার, কাউন্টিং স্টাফ এবং অনুমোদিত এজেন্ট ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার নেই। এ বার বিশেষ কিউআর কোড যুক্ত আইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে। তিন বার পরীক্ষার পর তবেই ভিতরে প্রবেশের ছাড়পত্র মিলবে। রিটার্নিং অফিসার ও পর্যবেক্ষক ছাড়া কারও মোবাইল ব্যবহারের অনুমতি নেই। হুগলিতে ১৮টি কেন্দ্রের জন্য ৪টি মহকুমা এবং বাঁকুড়ার ১২টি কেন্দ্রের জন্য ৩টি স্ট্রংরুমে গণনার ব্যবস্থা হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজ্যে ৭৭টি কেন্দ্রে চলবে ভোটগণনা। জঙ্গলমহলের গণনাকেন্দ্রগুলি পরিদর্শন করে সিইও মনোজ অগ্রবাল আশ্বস্ত করেছেন, রাজ্য জুড়ে পর্যাপ্ত বাহিনী মোতায়েন থাকছে। স্ট্রংরুম নিয়ে আসা অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘ওখানে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা রয়েছে। শুধু অভিযোগ করলেই হয় না। লিখিত অভিযোগ এখনও পর্যন্ত কেউ করেননি।’ সোমবার দুপুর ১২টার মধ্যেই প্রাথমিক ইঙ্গিত মিলতে শুরু করবে। ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটের ‘রেজাল্ট’ বোতাম টিপলেই স্পষ্ট হবে জয়-পরাজয়ের ছবি। শেষে ১৭সি এবং ২০ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে ফল নথিভুক্ত হবে। ইভিএমের তথ্যের সঙ্গে ভিভিপ্যাট স্লিপ মিলিয়ে দেখার পরই আসবে চূড়ান্ত ঘোষণা। জনতা জনার্দনের রায় জানার অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছে বাংলা। প্রতিটি কক্ষের জন্য আলাদা প্রবেশ ও বাহির পথ থাকছে। ইভিএম আনা-নেওয়ার পথও হবে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। গণনাকক্ষ বড় হলে তা নির্দিষ্ট নিয়মে ভাগ করা হবে। এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে সরাসরি যাওয়া যাবে না। গণনাকেন্দ্রে প্রবেশ এবং ভেতরের অংশ থাকবে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর দখলে। মোবাইল বা কোনো অস্ত্র জমা রাখার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।সোমবারের ফলের দিকে তাকিয়ে এখন গোটা দেশ। তবে বিশৃঙ্খলা রুখতে এক চুল জমি ছাড়তে নারাজ কমিশন। সব মিলিয়ে কড়া প্রহরার মধ্যেই সোমবার ইভিএম থেকে বেরোবে আগামীর জনাদেশ। এই বিশাল যজ্ঞে কোনো ত্রুটি রাখতে চাইছে না নির্বাচন কমিশন। পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে প্রতিটি বুথ এবং স্ট্রংরুম এখন সুরক্ষিত। অশান্তি এড়াতে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।গণনার শেষে নির্দিষ্ট বুথের ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনা হবে। কন্ট্রোল ইউনিটের হিসাবের সাথে তা মিলিয়ে দেখা হবে। প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর প্রশাসন। সোমবার ভোরে ইভিএম বের করার সময় থেকেই শুরু হবে চূড়ান্ত সতর্কতা। কাউন্টিং এজেন্টদের নথিপত্র বারবার পরীক্ষা করা হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রতিটি ভোটের গতিপ্রকৃতি নথিবদ্ধ করা হবে। বাংলার জনমত কোন দিকে যায়, এখন সেটাই দেখার। প্রতীকী ফটো।