নয়া জামানা ডেস্ক : কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ইরান। আমেরিকার নিখুঁত টার্গেট আর ইজরায়েলি মিসাইলের সাঁড়াশি আক্রমণে খতম ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। শুধু খামেনেই নন, এই ভয়াবহ মার্কিন-ইজরায়েলি হানায় প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর কন্যা, জামাতা এবং নাতনিও। শনিবারের সেই রক্তক্ষয়ী হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার খামেনেইয়ের স্ত্রী মনসুরেখ খোজাস্তে বাঘেরজাদের মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত করেছে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এই ঘটনার পরেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের এই লেলিহান শিখা থেকে নিজেদের নাগরিকদের বাঁচাতে তৎপরতা শুরু করেছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, আটকে পড়া ভারতীয়দের নিরাপদে ফিরিয়ে আনাই এখন দিল্লির প্রধান অগ্রাধিকার। এদিকে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ‘বন্ধু’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘অজস্র ধন্যবাদ’ জানিয়েছেন নেতানিয়াহু । প্রসঙ্গত মোদির ইজরায়েল সফরের পরই ইরানে হামলা চালায় ইজরায়েল। আবার চিন ও রাশিয়া যুদ্ধ থামানোর জন্য কথা জানিয়েছে ।
শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই তেহরানের আকাশ চিরে ধেয়ে আসে একের পর এক শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র। মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনীর এই যৌথ আকাশপথ অভিযানের মূল লক্ষ্যই ছিল খামেনেইয়ের সুরক্ষিত বাসভবন। হামলার তীব্রতা এতটাই ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায় উত্তর তেহরানের বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরেই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে ঘোষণা করেন, ‘প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।’ এরপর রবিবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে অত্যন্ত কড়া ভাষায় লেখেন, ‘ইতিহাসের নিকৃষ্টতম মানুষগুলোর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। চেষ্টা করেও উনি আমাদের গোয়েন্দাদের নজরদারি এড়াতে পারেননি।’ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই নজিরবিহীন হামলাকে ‘বড় মাপের অন্যায়’ বলে তোপ দেগেছেন। দেশের বর্তমান টালমাটাল অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে আলিরেজা আরাফিকে।
কীভাবে খামেনেইয়ের হদিস পেল মোসাদ? এই প্রশ্নই এখন কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, তেহরানের ট্রাফিক সিসিটিভি ক্যামেরা হ্যাক করে খামেনেইয়ের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা। অন্য একটি সূত্র বলছে, শনিবার সকালে এক বিশেষ বৈঠকে যোগ দেওয়ার খবর লিক হয়ে গিয়েছিল। খামেনেই সাধারণত সন্ধ্যার দিকে বের হন, কিন্তু সেদিন সকালেই তিনি গন্তব্যে পৌঁছে যান। সেই খবর পাওয়ামাত্রই নেতানিয়াহু চূড়ান্ত হামলার নির্দেশ দেন। এমনকি এই অভিযানে সৌদি আরবেরও পরোক্ষ সমর্থন ছিল বলে জল্পনা তুঙ্গে। এদিকে ইজরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রে গুঁড়িয়ে গিয়েছে উত্তর তেহরানের মহাত্মা গান্ধী নামাঙ্কিত হাসপাতালও। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের এই ভয়াবহ ডামাডোলে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার ভারতীয়। বিমান পরিষেবা বন্ধ এবং আকাশসীমা সিল হয়ে যাওয়ায় অনেকেই সেখানে কার্যত বন্দি হয়ে পড়েছেন। সোমবার দিল্লির তরফে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশী আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সরকার সব ভারতীয়কে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ কর্নাটক সরকার জানিয়েছে, তাদের রাজ্যের অন্তত ১০০ জন সেখানে আটকে রয়েছেন। মোদী সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশের ভারতীয় মিশনগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ শুরু করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যেভাবে ‘অপারেশন গঙ্গা’র মাধ্যমে ভারতীয়দের ফেরানো হয়েছিল, এবারও তেমন কোনও বড়সড় উদ্ধারকাজের নীল নকশা তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এদিন ভারতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, ‘পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সেখানে থাকা ভারতীয়দের নিরাপত্তার জন্য পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে আমরা একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ভারত চায় আলোচনা এবং কূটনৈতিক পথে সকল সমস্যার সমাধান হোক।’
যুদ্ধের আঁচ শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই। কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পালটা হামলায় তিন মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে, আহত আরও পাঁচ। ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত গম্ভীর গলায় ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, যুদ্ধ এখনই থামছে না। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘দুঃখজনক যে, শেষ হওয়ার আগে আরও প্রাণ যাবে, আরও মৃত্যু হবে। তবে যা সম্ভব, আমরা করব।’ ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, প্রয়োজনে ইরানে আরও চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ এই ভয়াবহ আক্রমণ চালানো হবে। তাঁর দাবি, মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিনি জানিয়েছেন যে যদি দরকার হয় ইরানে হামলা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং তাতে আমেরিকার কোনও সমস্যা হবে না। ইজরায়েলও এই ধ্বংসলীলায় মার্কিন প্রশাসনের পূর্ণ সমর্থন পাবে।
আবার খামেনেই হত্যার প্রতিশোধ নিতে আক্রমণ চালালো ইরানের বন্ধু গোষ্ঠী হিজবুল্লা। সোমবার ভোর থেকেই পাল্টা প্রত্যাঘাত শুরু করেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বাহিনী। খাস লেবাননের রাজধানী বেইরুটের আকাশ এখন কালো ধোঁয়ায় ঢাকা। লেবানন সরকার অবশ্য হিজ়বুল্লার এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেনি। প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এই আক্রমণকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সন্দেহজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর আক্ষেপ, এর ফলে ইজরায়েলকে আগ্রাসন চালানোর ‘অজুহাত’ পাইয়ে দেওয়া হল। অন্যদিকে, সোমবার সৌদি আরবের সরকারি তেল পরিশোধন সংস্থা আরামকো-র ওপর ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। রাস টানুরা শহরে অবস্থিত এই পরিশোধনাগারটি লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়া হলে সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী তা মাঝপথেই গুলি করে নামায়। যদিও আরামকো-র ওপর হামলার ফলে বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহে বড়সড় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্রিটেনের বায়ুসেনা ঘাঁটিও ইরানের রোষ থেকে রেহাই পায়নি। সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার দাবি করেছিলেন যে তাঁরা এই প্রাথমিক হামলায় সরাসরি যুক্ত নন, কিন্তু ইরান সেই দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়ে সরাসরি ব্রিটিশ ঘাঁটিতেই আঘাত হেনেছে।
ভারত সরকার বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির দূতাবাসের সাথে প্রতিনিয়ত আলোচনা চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশী দিল্লির একটি বিবৃতিতে জানান যে, বিশ্বের যেখানেই ভারতীয়রা বিপদে পড়েছেন, মোদী সরকার তাঁদের উদ্ধার করেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী সন্ত্রাসবাদ এবং কট্টরপন্থাকে গোটা বিশ্বের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দিল্লির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন ভারতীয় মিশনগুলি প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অগ্নিকুণ্ড, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে। খামেনেইয়ের গোটা বংশ নির্মূল হওয়ার পর ইরান যে আরও ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের পথে হাঁটবে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারিতে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ।