ভরত বেরা, নয়া জামানা, পশ্চিম মেদিনীপুর: পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বালিচক-এর মাটিতে জন্ম নেওয়া শিল্পী দেবাশীষ বেরা আজ আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে এক পরিচিত নাম। ছোটবেলা থেকেই মাটির প্রতি ছিল তাঁর অদ্ভুত টান। বাড়ির পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ শিল্পঘন—তাঁর বাবা ছিলেন একজন দক্ষ মৃৎশিল্পী। বাবার পাশে বসে মাটির পুতুল গড়তে গড়তেই শিল্পের প্রতি জন্ম নেয় গভীর ভালোবাসা। সেই শৈশবের হাতেখড়িই একদিন তাঁকে পৌঁছে দেয় বিশ্বমঞ্চে।
দেবাশীষ বেরা কখনও নিজেকে এক মাধ্যমের মধ্যে আটকে রাখেননি। পাথর, মার্বেল, ব্রোঞ্জ, কংক্রিট, ফাইবার ও টেরাকোটা—সব মাধ্যমেই তিনি সমান দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর শিল্পে লোকজ ঐতিহ্য যেমন ধরা পড়ে, তেমনই আধুনিক চিন্তার প্রকাশও স্পষ্ট। নারীশক্তির প্রতীক, মানবজীবনের অনুভূতি, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং পরিবেশ সচেতনতার বার্তা—এসব বিষয় তাঁর ভাস্কর্যে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তিনি রেখেছেন উজ্জ্বল ছাপ। অস্ট্রিয়ার হ্যালেইন শহরে অনুষ্ঠিত গ্যালারি প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে তিনি ইউরোপীয় শিল্পমহলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক ভাস্কর্য কর্মসূচিতেও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন গর্বের সঙ্গে। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও তিনি কখনও ভোলেননি নিজের শিকড়। তাঁর শিল্পে বারবার ফিরে আসে বাংলার গ্রামীণ জীবন, মাটির গন্ধ এবং ভারতীয় দর্শনের গভীরতা।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে নারীর আত্মমর্যাদা তুলে ধরা ভাস্কর্য, পরিবেশ রক্ষার বার্তা বহনকারী শিল্পকর্ম এবং মানব-আত্মার আধ্যাত্মিক যাত্রা নিয়ে নির্মিত বৃহৎ মার্বেল ভাস্কর্য। প্রতিটি সৃষ্টিই দর্শকদের ভাবতে শেখায়।
শারীরিক অসুস্থতা ও কাজের সময় আঘাত পাওয়ার মতো বাধাও তাঁকে দমাতে পারেনি। শিল্পকে তিনি মনে করেন সাধনা। বর্তমানে নিজের স্টুডিওতে তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন, বালিচকের মাটিতেই গড়ে উঠুক আধুনিক শিল্পকেন্দ্র।
দেবাশীষ বেরা আজ শুধু শিল্পী নন, তিনি প্রেরণার প্রতীক—প্রমাণ করে দিয়েছেন, মাটির টান থাকলে সেই মাটিই একদিন মানুষকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে।
আরও পড়ুন-
নন্দীগ্রামে পুজো মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক বার্তা, তৃণমূলকে আক্রমণ করলেন শুভেন্দু অধিকারী