নয়া জামানা ডেস্ক : ‘যা দেখলাম, ৪ মে-র পরে বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে এই রাজ্যে আমাকে আসতেই হচ্ছে’! সোমবার ব্যারাকপুরের সভা থেকে এভাবেই সরাসরি রাজ্যের শাসনক্ষমতা দখলের আগাম বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বুধবার বঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোট। তার আগে প্রচারের শেষ লগ্নে শিল্পাঞ্চলে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ভারতের ‘ভাগ্যোদয়’ তখনই সম্ভব যখন ‘পূর্বোদয়’ সফল হবে। মোদীর কথায়, ‘অঙ্গ, কলিঙ্গে কমল ফুটেছে। এখন বাংলার পালা।’ শিল্পাঞ্চলের রুগ্ন দশা এবং পাটকল শ্রমিকদের দুরবস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, এক সময়ের কর্মচঞ্চল ব্যারাকপুর এখন কারখানার বদলে বোমার শব্দে কাঁপে। মোদীর তোপ, ‘অকল্যান্ড পাটকলে কী হল সবাই দেখেছে। গত কয়েক মাসে এক ডজন পাটকল বন্ধ হয়েছে।’ তিনি স্পষ্ট জানান, কর্মসংস্থান না থাকায় যুবসমাজ বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছে, আর বৃদ্ধরা বাড়িতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন। এর দাওয়াই হিসেবে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের দাওয়াই দিয়েছেন তিনি। আশ্বাস দিয়েছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে সরকারি নিয়োগ হবে সময় মেনে এবং সরকারি কর্মীরা পাবেন ‘সপ্তম পে কমিশন’-এর সুবিধা। নির্বাচনী প্রচারের এই মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী বাংলার আবেগ ও আধ্যাত্মিক যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘আমার আধ্যাত্মিক মননের কেন্দ্র হল বাংলা।’ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর দাবি, ৩৭০ ধারা রদ করে একটি সঙ্কল্প পূরণ হয়েছে, এবার বাংলার সমৃদ্ধি ও শরণার্থী সমস্যার সমাধানই বিজেপির মূল লক্ষ্য। বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরমের সার্ধশতবর্ষে ‘সুজলং, সুফলং’-কে নীতি এবং ‘শস্য শ্যামলং’-কে রোজগারের পথ করার অঙ্গীকার করেন তিনি। মোদীর প্রতিশ্রুতি, ‘দুর্গার শক্তিকে সুরক্ষার গ্যারান্টি করব।’ তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওদের কাছে বাংলার ভবিষ্যতের কোনও রূপরেখা নেই।’ শাসকদলের বিরুদ্ধে চাল চুরি এবং সিন্ডিকেট রাজ চালানোর অভিযোগ আনেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন, ‘যারা কাজের রিপোর্ট কার্ড দিতে পারে না, তাঁদের কি ফের সুযোগ দেওয়া উচিত?’ তাঁর দাবি, তৃণমূল মা-মাটি-মানুষের কথা ভুলে গিয়ে শুধু গালিগালাজ আর হুমকির রাজনীতি করছে। মহিলাদের জন্য একগুচ্ছ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে গর্ভবতীদের ২১ হাজার টাকা দেওয়া হবে এবং মেয়েদের স্বনির্ভর করতে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ মিলবে। শহরের উন্নয়নের প্রসঙ্গে মোদী কলকাতাকে ‘সিটি অফ ফিউচার’ করার স্বপ্ন দেখান। অনুপ্রবেশ ইস্যু উসকে দিয়ে তাঁর হুঙ্কার, ‘কোনো ভারতীয় নাগরিকের সমস্যা হবে না, কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের ছাড়া হবে না।’ মতুয়া ও নমশূদ্রদের নাগরিকত্ব দেওয়ার গ্যারান্টিও দেন তিনি। মেট্রো রেলের বিস্তার ও বৈদ্যুতিন বাসের নেটওয়ার্ক তৈরির পাশাপাশি প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই রাজ্যে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ চালুর কথা ঘোষণা করেন মোদী। ব্যারাকপুরের শিল্পাঞ্চল এক সময় সারা ভারতের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড ছিল। আজ সেই এলাকা কেন পিছিয়ে পড়ল, সেই প্রশ্ন তুলে তৃণমূলের ‘জঙ্গলরাজ’কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন মোদী। তিনি বলেন, ‘আপনাদের রোজগার বন্ধ হচ্ছে। গুন্ডাদের রোজগারের জায়গা, বোমার কারখানা ফুলেফেঁপে উঠছে।’ মোদীর অভিযোগ, বর্তমানে তৃণমূলের সিন্ডিকেট এতটাই প্রবল যে নিজের বাড়ি বা দোকান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলেও তাদের অনুমতি নিতে হয়। এই সিন্ডিকেটরাজ হঠাতে বাংলার মানুষের সাহায্য চেয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই শিল্পাঞ্চলকে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র অন্যতম বড় হাবে পরিণত করা হবে। নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়ে প্রধানমন্ত্রী বাংলার শিক্ষিত বেকারদের উদ্দেশ্যে বড় বার্তা দিয়েছেন। তিনি গ্যারান্টি দিয়ে বলেন, বিজেপি সরকার গঠনের পর সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা আসবে এবং শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণ করা হবে। সরকারি কর্মীদের ভয়মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, তৃণমূলের ভীতি কাটিয়ে তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হবে। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতির প্রসারে স্কুলে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব তৈরি এবং আর্ট ও গেমিং ক্ষেত্রে নতুন মঞ্চ গড়ার রূপরেখাও পেশ করেন তিনি। গ্রামীণ মানুষের জন্য ১২৫ দিনের কাজের গ্যারান্টি ও কারিগরদের আয় বৃদ্ধিতে পিএম বিশ্বকর্মা যোজনার সুফলের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। নারীশক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে মোদী বলেন, ‘অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গের নারীশক্তি ভরসা করে বিজেপি-তে।’ তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে তৃণমূল সরকার মেয়েদের সুরক্ষার জন্য কিছুই করেনি। উল্টে সন্দেশখালি বা অন্যান্য জায়গায় মহিলাদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার বিজেপিই করবে বলে দাবি করেন তিনি। ‘সব ফাইল খুলব’— এই হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, তৃণমূলের আমলে হওয়া সব অপকর্মের হিসাব নেওয়া হবে। পাকা ঘর, কলেজে ভর্তির টাকা এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজকে তিনি তাঁর ‘মোদীর গ্যারান্টি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সবশেষে নেতাজির সেই বিখ্যাত আহ্বানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মোদী বলেন, ‘নেতাজি বলেন, রক্ত দাও, স্বাধীনতা দেব। আপনারা ৭০ বছর কংগ্রেস, বাম, তৃণমূলকে দিয়েছেন। একটা সুযোগ বিজেপি-কে দিন।’ তিনি মানুষকে আহ্বান জানান যেন ভোট দেওয়ার সময় তাঁরা সিন্ডিকেটের গুন্ডাদের ভয় না পান। তৃণমূলের পরিবারবাদ ও তোষণের রাজনীতি থেকে বাংলাকে মুক্ত করে হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেন তিনি। কলকাতার পরিচয় বদলে দেওয়া অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াতে এবং ‘মেট্রো’র দ্রুত প্রসারের স্বার্থে পদ্ম চিহ্নে ভোট দিতে বুথ পর্যায়ের কর্মীদের উৎসাহ জোগান প্রধানমন্ত্রী। মোদীর স্পষ্ট বার্তা, এই লড়াই বাংলার নব নির্মাণের লড়াই। ফাইল ফটো।
‘ফর্ম-৬’ দিয়ে ভিন রাজ্যের ভোটার ঢুকছে, বিজেপিকে বিঁধে জ্ঞানেশকে চিঠি মমতার