নয়া জামানা ডেস্ক : কলকাতার রাজপথে জনজোয়ার নামিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের যবনিকা টানলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার বিকেলে যাদবপুরের সুকান্ত সেতু থেকে শুরু হওয়া এই মহামিছিলে আক্ষরিক অর্থেই জনসুনামি আছড়ে পড়ল। বুধবার বঙ্গে দ্বিতীয় দফার হাই-ভোল্টেজ ভোট। তার ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে শহরের পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্র ছুঁয়ে নিজের খাসতালুক ভবানীপুরে বিজয়োৎসবের মেজাজে প্রচার শেষ করলেন তিনি। মিছিলের শেষভাগে বিহারের আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের উপস্থিতি এদিনের কর্মসূচিতে বিশেষ রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। এদিন বিকেল সাড়ে ৩টে নাগাদ সুকান্ত সেতু থেকে মিছিলের সূচনা হয়। নেত্রীর পাশে ছিলেন অরূপ বিশ্বাস, দেবব্রত মজুমদার, দেবাশিস কুমার, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এবং জাভেদ খানের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীরা। পাঁচ বিধানসভা কেন্দ্র— যাদবপুর, কসবা, রাসবিহারী, বালিগঞ্জ ও ভবানীপুরের ওপর দিয়ে যাওয়া এই মিছিলে কর্মী-সমর্থকদের ভিড় ছিল রেকর্ড ছোঁয়া। তীব্র গরমকে উপেক্ষা করেই কাতারে কাতারে মানুষ শামিল হন মিছিলে। রাস্তার দু’ধারে দাঁড়ানো মহিলাদের উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা। কোথাও আবার বাড়ির ছাদ বা বারান্দা থেকে তৃণমূল নেত্রীর উদ্দেশে ঝরে পড়ে অবিরাম পুষ্পবৃষ্টি। শারীরিক ধকল সামলাতে এদিন বেশ কৌশলী ছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সুকান্ত সেতু থেকে ঢাকুরিয়া ব্রিজ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়ার পর তিনি আচমকাই একটি স্কুটিতে সওয়ার হন। স্কুটিতে চেপেই তিনি সরাসরি পৌঁছান গোলপার্ক এলাকায়। গোলপার্ক থেকে ফের শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় দফার পদযাত্রা। মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ বাড়াতে দীর্ঘ পথ হেঁটে বালিগঞ্জে আসার পর, সেখান থেকে আরও একবার স্কুটিতে চড়ে রওনা দেন তিনি। তবে প্রচারের শেষভাগে হাজরা ক্রসিং থেকে গোপালনগর পর্যন্ত পুরো পথটাই টানা হেঁটে অতিক্রম করেন মমতা। রাস্তার দুধারে ভিড় করা মানুষের দিকে হাসিমুখে হাত নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করতে দেখা যায় তাঁকে। নিরাপত্তার কড়া ঘেরাটোপের মাঝেই তিনি বারবার সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ২০২৬ সালের এই বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রচারে বারবার ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মেজাজ ধরা পড়েছে। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন থেকে শুরু করে দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা আম আদমি পার্টির সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়াল— সকলেই তৃণমূলের হয়ে প্রচার অভিযানে ঝড় তুলেছেন। কিন্তু প্রচারের একেবারে শেষবেলায় তেজস্বী যাদবকে খোদ ভবানীপুরের মাটিতে নিয়ে আসা তৃণমূলের এক গভীর রাজনৈতিক চাল বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। দক্ষিণ কলকাতার হিন্দিভাষী ভোটারদের মন জয়ে তেজস্বীর জনপ্রিয়তা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। একইসঙ্গে আরজেডি ও তৃণমূলের সুদৃঢ় বন্ধুত্বের বার্তাও এই মহামিছিলের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হল। নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের ২৯৪টি কেন্দ্রেই কড়া নজর দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমদিকে জেলাগুলোতে এবং প্রথম দফার আসনগুলোতে জোর দিলেও প্রচারের অন্তিম লগ্নে নিজের দুর্গ রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। এর আগে ভবানীপুরের দেখভালের দায়িত্ব অরূপ বিশ্বাস বা ফিরহাদ হাকিমদের ওপর থাকলেও, সোমবারের রোড-শো প্রমাণ করল শেষ কথা বলবেন ঘরের মেয়েই। সুকান্ত সেতু থেকে গোপালনগর— মাইলের পর মাইল জুড়ে থাকা এই জনসমুদ্রই যেন বুঝিয়ে দিল শেষলগ্নের লড়াইয়ে এক চুলও জমি ছাড়তে রাজি নন মমতা। সব মিলিয়ে প্রচারের অন্তিম লগ্নে কলকাতায় আক্ষরিক অর্থেই ‘শো-স্টপার’ হয়ে রইলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী। এদিনের মিছিলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ তৃণমূল শিবিরের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। দিনশেষে এই মেগা রোড-শো কলকাতার বুকে এক নয়া নজির সৃষ্টি করল।