ব্রেকিং
[pj-news-ticker]

অসম্পূর্ণ থাকার অধিকার

বাপন দেব লাড়ু আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন জীবনকে শুধু বাঁচলেই হয় না, তাকে দেখাতেও হয়। কে কতটা সফল, কে কতটা সুখী, কে কোথায় ঘুরতে গেল, কে কী খেল, কে কী কিনল, কে কার সঙ্গে সময় কাটাল, আর....

অসম্পূর্ণ থাকার অধিকার

বাপন দেব লাড়ু আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন জীবনকে শুধু বাঁচলেই হয় না, তাকে....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


বাপন দেব লাড়ু

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন জীবনকে শুধু বাঁচলেই হয় না, তাকে দেখাতেও হয়। কে কতটা সফল, কে কতটা সুখী, কে কোথায় ঘুরতে গেল, কে কী খেল, কে কী কিনল, কে কার সঙ্গে সময় কাটাল, আর কে কতটা সুন্দর ভাবে তার জীবনকে উপভোগ করছে, সবকিছুরই যেন প্রকাশ্য হিসাব দিতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই হিসাবের একটি বড় মঞ্চ। সেখানে মানুষ নিজের জীবনের আনন্দ, সাফল্য, অভিজ্ঞতা ও অর্জন ভাগ করে নেয়। এটি নিঃসন্দেহে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পথ খুলেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার একটি নতুন প্রবণতাও।

বাস্তব জীবন কি কখনও নিখুঁত হয়?

মানুষের জীবনে ব্যর্থতা থাকবেই, ভুল থাকবেই, অনিশ্চয়তাও থাকবেই, সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকবেই, কখনও অর্থের অভাব থাকবেই, আবার কখনও আত্মবিশ্বাসেরও। কখনও নিজের কাছেই নিজেকে অপরিচিত বলে মনে হবে। এগুলো জীবনের ব্যতিক্রম নয়, বরং জীবনেরই স্বাভাবিক অংশ। অথচ আজকের সমাজ আমাদের শেখাচ্ছে, দুর্বলতা দেখানোই যাবে না। সবসময় আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, সফল হতে হবে, সুন্দর দেখতে হবে, নিজের কর্মজীবনে এগিয়ে থাকতে হবে এবং একই সঙ্গে সুখীও দেখাতে হবে।

এই ‘সবসময় ভালো থাকার’ চাপটি নিঃশব্দে মানুষের মানসিক জগতে গভীর প্রভাব ফেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমস্যাটি মাধ্যমটির অস্তিত্বে নয়, বরং আমরা সেটিকে কীভাবে ব্যবহার করছি এবং তার প্রভাবকে কীভাবে সামলাচ্ছি, তার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। সেখানে সাধারণত মানুষের জীবনের নির্বাচিত মুহূর্তগুলোই সামনে আসে। ফলে অন্যের সাফল্য, ভ্রমণ, সুন্দর সম্পর্ক কিংবা অর্জনের ছবি দেখতে দেখতে নিজের জীবনের স্বাভাবিক ব্যর্থতা ও অনিশ্চয়তাগুলো অনেক সময় বেশি প্রকট মনে হয়। কেউ নতুন বাড়ি কিনেছে, কেউ বিদেশে ঘুরতে গেছে, কেউ চাকরি পেয়েছে, কেউ ব্যবসায় সফল হয়েছে। আমরা তাদের জীবনের দৃশ্যমান সাফল্য দেখি, কিন্তু তাদের অদৃশ্য সংগ্রাম দেখি না। ফলে নিজের জীবনকে ক্রমশ ছোট মনে হতে থাকে। মনে হয়, “সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমি পিছিয়ে আছি।” এই তুলনা একসময় আত্মঅসন্তোষে পরিণত হতে পারে। মানুষ নিজের ‘অর্জন’কে আর ‘অর্জন’ বলে মনে করতে পারে না। একটি সাফল্যের পরেই আসে পরবর্তী সাফল্যের চাপ। একটি লক্ষ্য পূরণ হলেই আরেকটি লক্ষ্য সামনে দাঁড়ায়। বিশ্রাম তখন অলসতা, ধীরগতি তখন ব্যর্থতা এবং সাধারণ জীবন তখন যেন অযোগ্যতার প্রমাণ। তবে এই চাপের দায় শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমস্যার পূর্ণ সমাধান হয় না। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সাফল্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলিও এর জন্য দায়ী। আমরা অনেক সময় একজন মানুষকে তার পেশা, আয়, পরীক্ষার ফল, চেহারা কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করি। ফলে ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয় নিজেকে প্রমাণ করার এক নিরন্তর তাগিদ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই চাপ শুধু তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শিশু থেকে প্রবীণ, প্রত্যেক বয়সের মানুষই কোনো না কোনোভাবে ‘পারফেক্ট’ হওয়ার সামাজিক প্রত্যাশার মুখোমুখি। শিশুদের কাছে ভালো ফলের চাপ, তরুণদের কাছে ক্যারিয়ারের চাপ, মধ্যবয়সে অর্থ ও সামাজিক অবস্থানের চাপ, আর প্রবীণদের কাছে সুস্থ ও সক্রিয় থাকার চাপ। প্রত্যেক পর্যায়েই যেন একটি অদৃশ্য মানদণ্ড তৈরি করে দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে না পারলে মনে হয় আমরা ব্যর্থ।

কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা প্রয়োজন: আমাদের কি সত্যিই নিখুঁত হতে হবে?

সম্ভবত না।

কারণ মানুষের সৌন্দর্য তার নিখুঁততায় নয়, তার অসম্পূর্ণতায়। যে মানুষ ভুল করে আবার শেখে, যে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়, যে নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করতে পারে, তার জীবনই হয়তো সবচেয়ে বাস্তব জীবন। সবসময় শক্ত থাকার প্রয়োজন নেই। কখনও ক্লান্ত হওয়া, থেমে যাওয়া, সাহায্য চাওয়া কিংবা নিজের মতো করে বেঁচে থাকাও মানুষের অধিকার।

আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেও তাই একটি পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তানকে শুধু জিজ্ঞেস করা উচিত নয়, “কত নম্বর পেয়েছ?” বরং জিজ্ঞেস করা দরকার, “কেমন আছ?” তরুণকে শুধু “কী চাকরি করো?” বলে বিচার না করে জানতে হবে, “তুমি কি তোমার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট?” আর একজন মানুষকে তার সম্পদ, সৌন্দর্য বা সাফল্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে তার মানবিকতার ভিত্তিতে দেখতে শিখতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে তাই শত্রু হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে তার পার্থক্য বোঝা। একটি ছবি, একটি পোস্ট বা একটি সাফল্যের গল্প একটি মানুষের সম্পূর্ণ জীবন নয়। যেমন নিজের জীবনের খারাপ সময়কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করাও স্বাভাবিক, তেমনই অন্যের আনন্দের মুহূর্ত দেখে তার পুরো জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঠিক নয়।

তাই নিখুঁত জীবনের প্রতিযোগিতা থেকে একটু বেরিয়ে এসে নিজের বাস্তব জীবনকে গ্রহণ করা জরুরি। সব প্রশ্নের উত্তর আজই জানতে হবে না। সব স্বপ্ন একই সময়ে পূরণ হতে হবে না। প্রত্যেকের জীবনের গতি আলাদা, পথ আলাদা, গল্পও আলাদা।

আমাদের নতুন করে শিখতে হবে, অসম্পূর্ণ হওয়া ব্যর্থতা নয়।

বরং নিজের অসম্পূর্ণতাকে মেনে নিয়েও এগিয়ে চলার নামই জীবন। কারণ নিখুঁত মানুষ হয়তো কল্পনায় থাকে, কিন্তু অসম্পূর্ণ মানুষই বাস্তবে বাঁচে। আর হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো, অন্যের চোখে নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা না করে নিজের চোখে সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠা।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর