নয়া জামানা, কলকাতা : বকেয়া মহার্ঘভাতা বা ডিএ নিয়ে নবান্নের অন্দরে অস্বস্তি আরও বাড়ল। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মেটানোর ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ‘উদাসীনতা’ ও ‘গড়িমসি’র অভিযোগ তুলে এবার সরাসরি আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করল সরকারি কর্মচারীদের সংগঠন সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। শীর্ষ আদালতের নির্দেশকে ‘ইচ্ছাকৃত ও সজ্ঞানে’ লঙ্ঘন করা হয়েছে, এই মর্মে ফের একবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কড়া নাড়লেন আন্দোলনকারীরা।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্রের বেঞ্চ ডিএ মামলায় এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছিল। আদালত সাফ জানিয়েছিল, মহার্ঘভাতা সরকারি কর্মচারীদের দয়া নয়, বরং আইনি অধিকার। সেই রায়ে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একইসঙ্গে বাকি ৭৫ শতাংশ বকেয়া মেটানোর রূপরেখা তৈরি করতে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়। আদালতের নির্দেশ ছিল, ওই কমিটি নির্ধারিত বকেয়ার প্রথম কিস্তি রাজ্যকে মেটাতে হবে ৩১ মার্চের মধ্যে।
কিন্তু অভিযোগ, সময়সীমা পার হতে চললেও রাজ্যের তরফে কোনও হেলদোল দেখা যায়নি। সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের দাবি, বকেয়া মেটানো তো দূরস্থান, আদালতের নির্দেশে তৈরি হওয়া কমিটি আলোচনার জন্য সময় চাইলেও রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষ মহল থেকে কোনও সদুত্তর মেলেনি। এই প্রেক্ষাপটেই রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এবং অর্থসচিবের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিস পাঠিয়েছিল যৌথ মঞ্চ। কিন্তু তাতেও জল না গড়ায় এবার সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন সরকারি কর্মীরা।
সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ রাজ্য সরকারের এই অনড় মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ দেওয়ার রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। রাজ্য সরকারের কার্যকলাপ দেখে আমাদের মনে হয়েছে, তারা ইচ্ছাকৃত ভাবে আদালতের রায়কে মান্যতা দিচ্ছে না। বকেয়া মেটানোর কোনও প্রস্তুতি বা মানসিকতা দেখা যাচ্ছে না। তাই আদালত ২৫ শতাংশ মেটানোর যে নির্দেশ দিয়েছে, শুধু সেটুকুর উপরে আমরা আদালত অবমাননার মামলা করেছি।’
সরকারপক্ষের এই টালবাহানাকে ‘সংবিধান অবমাননা’ হিসেবেই দেখছে আন্দোলনকারী মহল। ভাস্করের কথায়, ‘শীর্ষ আদালতের প্রতি সম্মান দেখানোর কোনও মানসিকতা নেই রাজ্য সরকারের। এমন একটা সরকারকে নির্বাচিত করা হয়েছে, যাদের এই দেশের সংবিধানের প্রতিও ন্যুনতম সম্মানবোধ নেই। প্রশাসনিক তৎপরতা নেই। বাধ্য হয়ে শরণাপন্ন হয়েছি। না জেনে করেছেন এমনটাও নয়।’ তাঁদের দাবি, রাজ্য সরকার চাইলে রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানাতে পারত, কিন্তু তাও তারা করেনি। অথচ প্রাপ্য টাকাও কর্মীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না।
ডিএ-র দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে শহিদ মিনারের পাদদেশে অনশন ও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন সরকারি কর্মচারীরা। বারবার আইনি লড়াইয়ে রাজ্য সরকারের যুক্তি ধোপে না টিকলেও আর্থিক সংকটের দোহাই দিয়ে ডিএ পিছিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়ে আসছে নবান্ন। তবে এবার সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশকে এভাবে ‘ফুত্কারে’ উড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজ্যকে চরম আইনি পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। বকেয়া টাকা না মেটানো এবং আদালতের রায়কে গুরুত্ব না দেওয়ার এই অভিযোগকে হাতিয়ার করেই এবার আইনি লড়াইয়ের জল কতদূর গড়ায়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে এখন ওয়াকিবহাল মহল।