নয়া জামানা, কলকাতা : বাংলার রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র বা একই পরিবারের সদস্যদের ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই পরিবারের পরিচিতি যদি হয় বাম আন্দোলনের অন্যতম স্তম্ভ ক্ষিতি গোস্বামীর সঙ্গে, তবে তার অভিঘাত হয় সুদূরপ্রসারী। মঙ্গলবার রাজ্য বিজেপি সদর দফতরে আরএসপি-র প্রয়াত দাপুটে নেতা ক্ষিতি গোস্বামীর ছোট কন্যা কস্তুরী গোস্বামীর পদ্ম-পতাকা হাতে তুলে নেওয়া সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এল। দিদি বসুন্ধরা গোস্বামী যেখানে তৃণমূলের কাউন্সিলর, সেখানে মেজ বোন কস্তুরীর এই ‘উল্টো পথ’ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন সরগরম রাজ্য রাজনীতি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে যখন ঘর গোছাতে ব্যস্ত বঙ্গ বিজেপি, ঠিক তখনই বাম ঘরানার এই ‘ঘরের মেয়ে’র গেরুয়া শিবিরে অন্তর্ভুক্তি রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
রাজ্য বিজেপি সদর দফতরে মঙ্গলবার এক জমকালো অনুষ্ঠানে কস্তুরীর হাতে দলীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং শংকর ঘোষের মতো শীর্ষ নেতারা। আইনের ছাত্রী কস্তুরী এ দিন রাজনীতির ময়দানে পা রেখেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, কস্তুরীর দিদি বসুন্ধরা গোস্বামী বর্তমানে ৯৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর। ২০২১ সালের পুরভোটের আগে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি শাসকদলে যোগ দিয়েছিলেন। এবার মেজ বোনের উল্টো পথেই হাঁটলেন কস্তুরী।
আরএসপি-র দাপুটে নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন ক্ষিতি গোস্বামী। তবে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দলের দূরত্ব ছিল দীর্ঘদিনের। ২০১১ সালে পরিবর্তনের পর ক্ষিতি-জায়া মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে ক্ষিতি গোস্বামীর প্রয়াণের পর থেকেই তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জল্পনা ছিল তুঙ্গে। বসুন্ধরা তৃণমূলে থিতু হলেও কস্তুরী শেষ পর্যন্ত পদ্ম-পতাকা হাতে তুলে নিলেন। এ দিন শুধু কস্তুরী নন, বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন প্রাক্তন এনএসজি কর্তা দীপাঞ্জন চক্রবর্তী, সিআরপিএফ-এর প্রাক্তন কর্তা বিপ্লব বিশ্বাস এবং শিল্পোদ্যোগী ডঃ অক্ষয় বিঞ্জেরকাও।
এ দিনের কর্মসূচিতে ‘আঁধারের কত কথা’ নামে একটি বই প্রকাশ করা হয়। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, রাজ্যের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হিংসার খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে এই বইতে। যোগদানের এই পর্যায়কে আত্মবিশ্বাসের সুরেই ব্যাখ্যা করেছেন শমীক ভট্টাচার্য। সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে তিনি সাফ জানান, ‘কেন্দ্রীয় বাহিনী বা এসআইআর কিছু হোক আর না হোক। ইডি, সিবিআই অফিস বন্ধ করে দিক। তাও বিজেপি আসবে। তৃণমূল হারবে।’
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন বঙ্গ বিজেপি নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে মরিয়া, ঠিক তখনই কস্তুরীর মতো তরুণ মুখকে সামনে আনা তাদের এক বড় কৌশল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এদিকে একই পরিবারের এক সদস্য শাসকদলে এবং অন্যজন প্রধান বিরোধী দলে থাকায় তৃণমূলের জন্য এটি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। বিশেষ করে বিজেপির ‘পরিবারবাদ’ বিরোধী প্রচারের মুখে এটি তৃণমূলকে কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। কস্তুরী যদি দিদির ওয়ার্ডে বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রচার শুরু করেন, তবে তা শাসকদলের জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা সম্ভবত বাম শিবিরের জন্য। ক্ষিতি গোস্বামীর মতো নেতার উত্তরসূরিদের কেউই শেষ পর্যন্ত বাম পন্থায় থাকলেন না , একজন গেলেন ডানে (তৃণমূল), অন্যজন অতি-ডানে (বিজেপি)। এটি বামেদের নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে এক নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে, যা তাদের রক্তক্ষরণ আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। সব মিলিয়ে ভোটের আগে কস্তুরীর এই যোগদান তৃণমূল ও বামেদের জন্য অস্বস্তির কি না, তা নিয়ে এখন চর্চা তুঙ্গে।
আরও পড়ুন-
‘দেশ বিক্রি’র তোপে বিদ্ধ বিজেপি, রাহুলের সাংসদ পদ বাতিলের দাবি