নয়া জামানা ডেস্ক : যুদ্ধের বাজারে শেষ হাসি হাসল ভারতই। রাশিয়ার থেকে তেল কেনায় মার্কিন রক্তচক্ষু আর নেই। প্রত্যাহার করা হয়েছে ২৫ শতাংশ ‘শাস্তিমূলক শুল্ক’। বদলে আগামী ৫ বছরে আমেরিকার থেকে ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার পণ্য কিনবে ভারত। তবে এই মেগা চুক্তিতেও নিজেদের জমি এক ইঞ্চিও ছাড়েনি নয়াদিল্লি। বিশেষত, দেশের কৃষিক্ষেত্রকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রবল ‘চাপ’ উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘যে সব পণ্য উৎপাদনে আমরা আত্মনির্ভর, সেগুলিকে এই চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে।’ ফলে বিরোধীদের যাবতীয় অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়ে আত্মনির্ভর ভারতের জয়গানই এখন দিল্লির অলিন্দে।
শনিবার দিল্লিতে এক হাই-ভোল্টেজ সাংবাদিক বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, মার্কিন কৃষিপণ্যকে ভারতীয় বাজারে অবাধ ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। আমেরিকা চেয়েছিল ভারতের দুগ্ধ এবং কৃষি বাজারে বড়সড় থাবা বসাতে। কিন্তু নয়াদিল্লি সেই দাবি পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছে। বরং ভারত বেছে বেছে লাল জোয়ার, ট্রি নাটস এবং ওয়াইন-স্পিরিটসের মতো গুটিকয়েক পণ্যের জন্য দরজা খুলেছে। উল্টে মার্কিন মুলুকে ভারতীয় চা, কফি, কলা ও আমের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্ক আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে মোদী সরকার। পীযূষ গোয়েলের দাবি, ‘আমরা এমন কোনও কাজ করিনি যা কৃষকদের ক্ষতির কারণ হবে।’ বিরোধীদের কটাক্ষ করে তিনি বলেন, এই ঐতিহাসিক চুক্তি দেখে একদল মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছেন।
বাণিজ্যিক এই দড়ি টানাটানিতে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের পণ্যের ওপর চাপানো বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যার জেরে এখন সার্বিক মার্কিন শুল্ক ২৫ থেকে কমে ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ভারতীয় বস্ত্র, চামড়া, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক শিল্পের সামনে আমেরিকার বিশাল বাজার উন্মুক্ত হয়ে গেল। পীযূষ গোয়েল বলেন, ‘২০৪৭ সালের উন্নত ভারত গড়ার যাত্রাপথে আজ একটি বড় দিন।’ এই চুক্তির ফলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সামনে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এই চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা।
তবে এই পাওয়ার লিস্টে ভারতকে দিতেও হচ্ছে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি। যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলার বা ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার মার্কিন পণ্য আমদানি করবে ভারত। এর মধ্যে রয়েছে খনিজ তেল, গ্যাস, রান্নার কয়লা, বিমান ও বিমানের যন্ত্রাংশ এবং উন্নত প্রযুক্তিগত পণ্য। এমনকি ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক সরঞ্জামও আমেরিকা থেকে কিনবে ভারত। ট্রাম্পের একটি বিশেষ শর্ত ছিল রাশিয়ার তেল নিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সই করা একটি কার্যনির্বাহী আদেশ বলছে, ‘ভারত রাশিয়ান ফেডারেশন থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তেল আমদানি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’ যদিও রুশ তেল নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে প্রশ্ন করা হলে বাণিজ্যমন্ত্রী কিছুটা কৌশলী অবস্থান নিয়ে জানান, বিদেশ মন্ত্রকই এই বিষয়ে সঠিক উত্তর দেবে।
কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় ভারত যে কতটা অনড় ছিল, তার খতিয়ান দিয়েছেন গোয়েল। তিনি সাফ জানান, জেনেটিকালি মডিফায়েড (জিএম) ফসল, মাংস, পোলট্রি, সয়াবিন, ভুট্টা, চাল, গম ও চিনির মতো স্পর্শকাতর পণ্যগুলিকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হয়নি। এমনকি দুধ, চিজ বা তামাকের ক্ষেত্রেও মার্কিন কৃষকরা কম শুল্কের সুবিধা পাবেন না। বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষায়, ‘মশলা, চা, কফি, নারকেল তেল, কাজু, বিভিন্ন ফল ও সবজি— এই সব পণ্য বিনাশুল্কে আমেরিকায় রপ্তানি করতে পারবে ভারত।’ অর্থাৎ, ঘরোয়া বাজারকে সুরক্ষিত রেখেই বিদেশের বাজারে ঝাণ্ডা ওড়ানোর ছক কষেছে দিল্লি।
অন্যদিকে, ডিজিটাল বাণিজ্যের পথে বাধা এবং আমদানি লাইসেন্সিং সংক্রান্ত আইনি জটিলতাগুলিও ধাপে ধাপে সরিয়ে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত। আমেরিকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মান ভারত মেনে চলছে কি না, তা নিয়ে আগামী ছ’মাসের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই চুক্তির অন্তরালে চিনের মতো বাজার-বহির্ভূত শক্তির বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার বার্তাও রয়েছে। আপাতত এটি একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হলেও, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তির দিকে এটিই ভারতের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। ভারতের ব্যবসায়িক মহলে এই চুক্তি নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ফাইল ফটো।
আরও পড়ুন-
আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়া! আরও ছ’টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির পথে নয়া দিল্লি