ব্রেকিং

মাধ্যমিকের পর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা—নিজের পথ বেছে নেওয়া

সন্তানের ভবিষ্যৎ জোর করে গড়ে তোলা যায় না। বিশ্বাস, সংলাপ ও স্বাধীনতার মাধ্যমেই একজন আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক মানুষ তৈরি হয়। নিজের আগ্রহ থেকে বেছে নেওয়া পথই দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত সাফল্য ও মানসিক সুস্থতার ভিত্তি গড়ে দেয় — লিখেছেন দেবরাজ সাহা  ....

মাধ্যমিকের পর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা—নিজের পথ বেছে নেওয়া

সন্তানের ভবিষ্যৎ জোর করে গড়ে তোলা যায় না। বিশ্বাস, সংলাপ ও স্বাধীনতার মাধ্যমেই একজন আত্মবিশ্বাসী ও....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন

সন্তানের ভবিষ্যৎ জোর করে গড়ে তোলা যায় না। বিশ্বাস, সংলাপ ও স্বাধীনতার মাধ্যমেই একজন আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক মানুষ তৈরি হয়। নিজের আগ্রহ থেকে বেছে নেওয়া পথই দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত সাফল্য ও মানসিক সুস্থতার ভিত্তি গড়ে দেয় — লিখেছেন দেবরাজ সাহা

 

 

মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়া মানেই হাজার হাজার কিশোর-কিশোরীর জীবনে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এটি কেবল একটি পরীক্ষার পর্বের সমাপ্তি নয়; বরং জীবনের পরবর্তী দিশা নির্ধারণের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময়ে একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেমন দীর্ঘমেয়াদি হতাশার কারণ হতে পারে, তেমনই একটি সচেতন, মানবিক সিদ্ধান্ত খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। ঠিক এই কারণেই মাধ্যমিক-পরবর্তী সময়টি ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি, সমানভাবে অভিভাবক ও সমাজেরও বড় দায়িত্বের সময়।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজ এখনও এই সন্ধিক্ষণকে প্রায়শই নম্বর, তুলনা আর সামাজিক প্রতিযোগিতার ভারে চাপা দিয়ে ফেলে। কে কত নম্বর পেল, কার সন্তান বিজ্ঞান নিল, কে পিছিয়ে পড়ল—এই হিসেব-নিকেশের মধ্যে হারিয়ে যায় আসল প্রশ্নটি: শিশুটি আসলে কী হতে চায়? সে কোন পথে নিজেকে খুঁজে পায়?

আমাদের সমাজে বহুদিন ধরেই একটি গভীরভাবে প্রোথিত ধারণা কাজ করে। মাধ্যমিকের পর বিজ্ঞানই একমাত্র ‘নিরাপদ’ বা ‘সম্মানজনক’ পথ। তার পরে কিছুটা গুরুত্ব পায় বাণিজ্য, আর আর্টস বা ভোকেশনাল শিক্ষাকে দেখা হয় প্রায় শেষ আশ্রয় হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এর ফলে অসংখ্য কিশোর-কিশোরী নিজের স্বাভাবিক আগ্রহ, দক্ষতা ও স্বপ্নকে অগ্রাহ্য করে এমন এক পথে হাঁটতে বাধ্য হয়, যা তার মানসিক গঠন ও ব্যক্তিগত বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মাধ্যমিকের পর কোনও ছাত্র বা ছাত্রী বিজ্ঞান নেবে, না বাণিজ্য, না আর্টস, না কি কোনও কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষার পথে যাবে—এই সিদ্ধান্তের অধিকার সর্বাগ্রে তার নিজের হওয়া উচিত। অভিভাবকদের ভূমিকা এখানে পথপ্রদর্শকের, নিয়ন্ত্রকের নয়। সন্তানকে বোঝানো, বিকল্পের কথা বলা, বাস্তবতার ছবি তুলে ধরা অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কখনওই সুস্থ ভবিষ্যৎ তৈরি করে না।

অভিভাবকদের একটি কথা গভীরভাবে মনে রাখা জরুরি সন্তান কোনও পরীক্ষামূলক প্রকল্প নয়, কিংবা অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের মাধ্যমও নয়। সন্তানের জীবন তার নিজের। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত হয়তো সাময়িক সামাজিক স্বীকৃতি এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা জন্ম দেয় আত্মবিশ্বাসের অভাব, ভেতরের ক্ষোভ, মানসিক অবসাদ ও ভাঙনের। আজ সমাজে যে ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ, হতাশা এবং আত্মহানির ঘটনাগুলি আমরা লক্ষ্য করছি, তার পেছনে এই ‘একটাই সঠিক পথ’ ভাবনার সংস্কৃতিও কম দায়ী নয়।

অভিভাবকরাই সন্তানের আগ্রহ ও সক্ষমতাকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেন। কোন শিশু লেখালেখিতে স্বচ্ছন্দ, কে আঁকতে ভালোবাসে, কে যন্ত্রপাতি বা প্রযুক্তি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে পছন্দ করে, কে মানুষের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে—এই প্রবণতাগুলি হঠাৎ করে তৈরি হয় না। ছোটবেলা থেকেই এগুলি ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। সেই আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া, তাকে অবহেলা না করা এটাই একজন সচেতন অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব।

প্রয়োজনে সন্তানের সঙ্গে বারবার কথা বলা দরকার। তাকে শোনার ধৈর্য রাখতে হবে। অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরাই নিজেরা স্পষ্ট করে জানে না তারা কী চায়। সেই সময় অভিভাবকের কাজ হবে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া চাপ সৃষ্টি করা নয়। তথ্য দিন, বিকল্পের কথা বলুন, বিভিন্ন পেশা ও শিক্ষাক্ষেত্র সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনার সুযোগ করে দিন। প্রয়োজনে শিক্ষাবিদ, পরামর্শদাতা বা অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করুন। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তটি নিতে দিন সন্তানেরই।

মাধ্যমিকের পরের এই সময়টি শুধু বিষয় বাছাইয়ের নয় এটি হওয়া উচিত চরিত্র গঠনের সময়। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পেশা তৈরি করা নয়, মানুষ তৈরি করা। সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, সমাজের প্রতি সংবেদনশীলতা—এই গুণগুলি কোনও মার্কশিটে লেখা থাকে না। সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, বাস্তব জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, বিভিন্ন মানুষের সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা জানা এই সমস্ত কিছুই একজন কিশোরকে ভিতর থেকে পরিণত করে।

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। লেখালেখি, গান, নাটক, ছবি আঁকা বা নতুন ভাবনার চর্চাকে এখনও বহু পরিবার ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘সময় নষ্ট’ বলে মনে করে। অথচ আজকের বিশ্বে সৃজনশীলতাই নতুন চিন্তা, নতুন নেতৃত্ব ও নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে। সব সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি কর্মচারী হবে এই একরৈখিক ভাবনা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে।
মাধ্যমিকের পর সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হল তাকে বিশ্বাস করা। তার সক্ষমতার উপর আস্থা রাখা। তার পছন্দের পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া। কারণ জোর করে তৈরি করা সাফল্য বেশিদিন টেকে না, কিন্তু নিজের আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকে গড়ে ওঠা পথ মানুষকে দীর্ঘদিন এগিয়ে নিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা বিষয়ের নয়। আর্টস, সায়েন্স বা ভোকেশনাল কোনওটিই ছোট নয়। আসল প্রশ্ন হল, সেই পথে হাঁটছে কি না একজন আত্মবিশ্বাসী, সচেতন ও মানবিক মানুষ। অভিভাবক, শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজ—এই তিন পক্ষ যদি এই সত্যটিকে আন্তরিকভাবে মেনে নিতে পারে, তবেই এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি ছাত্রছাত্রীদের জীবনে সত্যিকারের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সময় হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর