নয়া জামানা, কলকাতা : বেনজির সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের গোটা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াটিই বাতিল করে দেওয়া হল। শনিবার রাতে বিজ্ঞপ্তি জারি করে কমিশন জানিয়েছে, গত বুধবার ওই কেন্দ্রে যে ভোট হয়েছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। ফলে আগামী সোমবার ফলতা বাদে রাজ্যের বাকি ২৯৩টি আসনে ভোটগণনা হবে। সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, গোটা দেশেও এই ধরনের নজির মেলা ভার। স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন করার পথে ফলতা কার্যত কমিশনের সাফল্যে বড়সড় ব্যর্থতার ‘দাগ’ লাগিয়ে দিল। কমিশন সূত্রে খবর, ফলতার বহু বুথে গুরুতর নির্বাচনী অপরাধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভঙ্গের ভুরিভুরি অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই কারণেই গোটা কেন্দ্রের ভোট বাতিলের এই কড়া পদক্ষেপ। স্থির হয়েছে, আগামী ২১ মে ফলতার ২৮৫টি বুথে নতুন করে ভোটগ্রহণ হবে। এই কেন্দ্রের ফল ঘোষণা হবে ২৪ মে। অর্থাৎ সোমবার রাজ্যের বাকি ২৯৩টি আসনের গণনা হলেও ফলতা থাকবে ব্রাত্য। ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই খবরের শিরোনামে ছিল ফলতা। বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা বনাম ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের ‘ঠান্ডা লড়াই’ নিয়ে চর্চা ছিল তুঙ্গে। ভোটের দিন ইভিএম কারচুপির অভিযোগ ওঠায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নির্দেশে বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত ফলতা-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকা স্ক্রুটিনি করেন। তাঁর পাঠানো রিপোর্টে ফলতার অবস্থা ছিল উদ্বেগজনক। সূত্রের খবর, সেখানে প্রায় ৩০টি বুথে পুনর্নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। স্ক্রুটিনিতে ধরা পড়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বহু বুথে রহস্যজনকভাবে ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। নেটওয়ার্ক সমস্যার অজুহাতে কন্ট্রোল রুমে সেই খবর পৌঁছয়নি। অনেক জায়গায় ইভিএমে টেপ লাগিয়ে বিরোধীদের প্রতীক ঢেকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বেলা ১টায় যখন সেই টেপ তোলা হয়, ততক্ষণে ওই বুথগুলোতে প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পড়ে গিয়েছিল। এই অনিয়ম দেখেই শেষ পর্যন্ত গোটা কেন্দ্রের ভোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
এদিকে ফলতা বিধানসভায় পুনর্নির্বাচনের নির্দেশের পরেই সরগরম রাজ্য রাজনীতি। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার করে বিজেপি যখন ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’কে কটাক্ষ করছে । বিজেপি নেতা অমিত মালব্য এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল চুরমার’। এর পাল্টা জবাবে অভিষেক লেখেন, ‘আপনাদের বাংলা বিরোধী গুজরাতি গ্যাং এবং তাদের দালাল জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষে আমার ডায়মন্ড হারবার মডেলে কালি ছেটানো সম্ভব নয়।’ আক্রমণের সুর চড়িয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের যা কিছু আছে, সব নিয়ে চলে আসুন। আপনাদের সবচেয়ে শক্তিধরকে পাঠান, দিল্লি থেকে কোন এক গডফাদারকে পাঠান। যদি ক্ষমতা থাকে ফলতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন।’ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনি বলেন, ‘দম থাকলে ফলতায় গোটা ভারত নিয়ে আসুন!’ এমনকি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘দালাল’ বলে তোপ দাগতেও ছাড়েননি তিনি। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের দাবি, তাঁর তিলে তিলে গড়া মডেল কালিমালিপ্ত করতে বিরোধীদের দশ জন্ম লেগে যাবে।
এদিকে সোমবার সকাল ৮টা থেকে রাজ্যের বাকি আসনগুলোতে ভোটগণনা শুরু হচ্ছে। প্রথমে পোস্টাল ব্যালট এবং পরে ইভিএমের ভোট গোনা হবে। দুপুর ১২টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে বাংলার মসনদে কে বসছে। তবে সবার নজর থাকলেও গণনার তালিকায় থাকল না ফলতা। সেখানে আবার নতুন করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করতে হচ্ছে প্রার্থীদের। ফলতার রায় আপাতত যন্ত্রবন্দি হওয়ার বদলে বাতিলের খাতায় চলে গেল।