নয়া জামানা ডেস্ক : ‘মেজোবোন’ নন্দীগ্রামের পর ‘বড়বোন’ ভবানীপুরেও হারল ঘরের মেয়ে। নিজের খাসতালুকে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাস্ত হলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে হারের ক্ষত ছিলই। এবার ভবানীপুরেও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। ব্যবধান আরও বাড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে তাঁকে হারালেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ের শংসাপত্র হাতে নিয়ে শুভেন্দু ঘোষণা করলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সন্ন্যাস হয়ে গিয়েছে।’ একদা মমতাকে ‘গুরু’ বলে মানতেন শুভেন্দু। পরে তৃণমূল ত্যাগ করে তিনি অমিত শাহকে ‘গুরু’ হিসেবে বেছে নেন। পরবর্তী সময়ে শুভেন্দু জানিয়েছিলেন, তিনি আর গুরু পাল্টাবেন না। সেই শিষ্যের হাতেই এবার চেনা ময়দানে ধরাশায়ী হলেন তৃণমূলনেত্রী। সোমবার সকাল থেকেই ভবানীপুরে ছিল চরম উত্তেজনা। ২০ রাউন্ডের গণনাপর্বে প্রতি মুহূর্তেই স্নায়ুর লড়াই চলেছে। শুরুতে মমতা এগিয়ে থাকলেও সপ্তম রাউন্ড থেকে ব্যবধান কমাতে শুরু করেন শুভেন্দু। ষোড়শ রাউন্ডে গিয়ে তিনি লিড নেন এবং শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করেন। নন্দীগ্রামে ব্যবধান ছিল ১৯৯৬ ভোটের, কিন্তু ভবানীপুরে জয়ের ব্যবধান এক লাফে পৌঁছল ১৫ হাজারে। সন্ধ্যার দিকে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্র ত্যাগ করার সময় মমতার চোখেমুখে ছিল ক্ষোভের ছাপ। তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। পুরোটা একতরফা। ধাক্কা দিয়েছে, মেরেছে। সিআরপিএফ-এর সামনে। আমি প্রার্থী, আমাকে ঢুকতে দেয়নি। এটা হচ্ছে দানবিক পার্টি। ১০০টারও বেশি সিট লুট করেছে। এই নির্বাচন কমিশন হল বিজেপি কমিশন।’ ফল ঘোষণার আগেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ভবানীপুর। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের সামনে তৃণমূল ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। মমতা যখন গণনাকেন্দ্রে পৌঁছন, তখন তাঁকে লক্ষ্য করে ‘চোর চোর’ স্লোগান ওঠে। অন্যদিকে, জয়ের পর উচ্ছ্বসিত শুভেন্দু এই জয়কে রাম-লক্ষ্মণের জয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথায়, ‘যাঁরা হিন্দুত্বের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, এই জয় তাঁদের প্রতি উৎসর্গ করলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো খুব দরকার ছিল।’ মমতার দাবি, এই ফলাফল মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘এটা কী ধরনের জয়! এটা ইমমোরাল ভিক্ট্রি। মোরাল ভিক্ট্রি নয়। পুরোটাই বেআইনি। জোর করে জিতেছে। লুট, লুট, লুট। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই।’ মঙ্গলবার বিকেলেই সাংবাদিক বৈঠকে বসবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুরের এই লড়াই ছিল কার্যত মরণ-বাঁচন যুদ্ধ। দেড় মাস ধরে এখানে প্রচারের ঝড় বয়ে গিয়েছিল। শুভেন্দুর মনোনয়নে খোদ অমিত শাহ হাজির ছিলেন। অন্যদিকে মমতাও শেষবেলায় সাতটি সভা ও ছ’টি পদযাত্রা করে এলাকা চষে ফেলেছিলেন। ভোটার তালিকা সংশোধন হওয়ায় এবার ৫০ হাজার ভোটার বাদ গিয়েছিলেন, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ‘মিনি ইন্ডিয়া’ খ্যাত এই কেন্দ্রের বিচিত্র জনবিন্যাস ও মিশ্র ভোটব্যাঙ্ক এবার ঝুঁকেছে পদ্মশিবিরের দিকেই। ভোটের দিনও মমতা প্রথা ভেঙে সকাল থেকে বুথে বুথে ঘুরেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। নিজের ‘বড়বোন’ আসনে হারের পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের বদলা ভবানীপুরে নিতে গিয়ে উল্টে বড় হারের মুখ দেখলেন তৃণমূলনেত্রী।