কুশল রায় ৷৷ নয়া জামানা ৷৷ উত্তরবঙ্গ ব্যুরো: ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি নাকি আরও বড় কোনো রাজনৈতিক উত্থান? ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট করে দিল যে, উত্তরবঙ্গ আজও ভারতীয় জনতা পার্টির অবিসংবাদিত দুর্গ হিসেবে অটুট রয়েছে। গঙ্গা দিয়ে গত পাঁচ বছরে অনেক জল বয়ে গেলেও উত্তরবঙ্গের মানুষের পদ্ম প্রীতিতে যে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি, তা রবিবারের নির্বাচনী ফলাফল আরও একবার হাতেনাতে প্রমাণ করে দিল। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে মালদা ও দুই দিনাজপুরের সমতল পর্যন্ত সর্বত্রই এখন প্রবল গেরুয়া ঝড় বইছে। উত্তরবঙ্গের মোট ৫৪টি বিধানসভা আসনের সিংহভাগই এখন বিজেপির দখলে চলে গিয়েছে, যা শাসক শিবিরের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবারের নির্বাচনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিলিগুড়ি বিধানসভা আসনটি। সেখানে বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ যে রেকর্ড জয় ছিনিয়ে নেবেন, তার আভাস বুথ ফেরত সমীক্ষাতেই মিলেছিল। কিন্তু বাস্তবের ফলাফল সমস্ত রাজনৈতিক হিসেবকে ছাপিয়ে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী তথা বর্ষীয়ান রাজনীতিক গৌতম দেবকে প্রায় ৬১,৯৯৪ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন শঙ্করবাবু। প্রাপ্ত ভোটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিনি একাই পেয়েছেন ১,০০,৮১৯টি ভোট। যদিও ভোটের আগে প্রচার চলাকালীন শঙ্কর ঘোষ সত্তর থেকে পঁচাত্তর হাজার ব্যবধানে জেতার লক্ষ্যমাত্রা রেখেছিলেন, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিলিগুড়ির মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ৬০ হাজার পার করা ব্যবধানে জয় কার্যত এক বিরল ও ঐতিহাসিক ঘটনা। এই জয় প্রমাণ করল যে, শিলিগুড়ির রাজনৈতিক মানচিত্রে শঙ্কর ঘোষের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা আজ আকাশচুম্বী উচ্চতায় পৌঁছেছে।
উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার মোট ৫৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি কার্যত একতরফা আধিপত্য বিস্তার করেছে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার এবং জলপাইগুড়ির মতো জেলাগুলোতে তৃণমূল কংগ্রেস খাতা খুলতে হিমশিম খেয়েছে। শেষ পাওয়া খবর ও প্রাথমিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, বিজেপি উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে ৩০টিরও বেশি আসনে নিজেদের জয় ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করেছে এবং আরও বেশ কিছু আসনে তারা গণনায় বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি আসনে শিখা চট্টোপাধ্যায় ১,০০,৮৫৯টি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি আসনে বিজেপি প্রার্থী আনন্দময় বর্মন ৯৭,৭৭৯ ভোটের পাহাড়প্রমাণ ব্যবধানে জয়ী হয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। এই জয়গুলি প্রমাণ করে যে প্রান্তিক এলাকার মানুষের মধ্যেও বিজেপির সমর্থন কতটা সুসংহত।
উত্তরবঙ্গের এই নির্বাচনী ফলাফলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জয়ের বিশাল ব্যবধান। শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ এলাকা থেকে শুরু করে ডুয়ার্সের গভীর চা বাগান অঞ্চল—অধিকাংশ আসনেই বিজেপি প্রার্থীরা ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার বা তারও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। শিলিগুড়ির বিভিন্ন আসনেই দশ হাজারের বেশি ব্যবধানে জয় এসেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সিএএ ইস্যু, চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিযোগকে বিজেপি যেভাবে প্রচারের প্রধান হাতিয়ার করেছিল, তার সুফল তারা ব্যালট বাক্সে হাতেনাতে পেয়েছে। সাধারণ মানুষ উন্নয়ন ও প্রতিশ্রুতির বদলে নিজেদের অধিকারের প্রশ্নেই হয়তো বিজেপিকে বেছে নিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিণবঙ্গের চিত্র যাই হোক না কেন, উত্তরবঙ্গ ফের একবার রাজ্যের শাসক দলকে কার্যত শূন্য হাতেই ফেরাল। শিলিগুড়ির রাজপথ থেকে কোচবিহারের অলিগলি—সবই এখন গেরুয়া আবিরের রঙে রঙিন। এই বিশাল জয়ের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শঙ্কর ঘোষ অত্যন্ত নম্রতার সাথে জানান যে, এই জয় তাঁর ব্যক্তিগত কোনো সাফল্য নয়, বরং এটি শিলিগুড়ির সাধারণ মানুষের আস্থার জয় এবং দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের ফসল। এই ফলাফলের ফলে আগামী দিনে রাজ্যের সামগ্রিক রাজনীতিতে উত্তরবঙ্গের গুরুত্ব ও রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা যে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল, তাতে রাজনৈতিক মহলের কোনো সন্দেহ নেই। এই গেরুয়া প্লাবন আগামী লোকসভা নির্বাচনেও বড় প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।