নয়া জামানা, কলকাতা : গড় বাঁচাতে মরিয়া লড়াইয়ে নেমেছিলেন তিনি। লক্ষ্য ছিল ১৯৯৯ সালের সেই রূপকথার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে গিয়েছে বহরমপুরের ভাগীরথী দিয়ে। লোকসভা নির্বাচনে ইউসুফ পাঠানের কাছে হারের পর এবার নিজের খাসতালুক বহরমপুর বিধানসভা উপনির্বাচনেও পরাস্ত হলেন অধীর চৌধুরী। বিজেপির বিদায়ী বিধায়ক সুব্রত (কাঞ্চন) মৈত্রর কাছে হার মানতে হলো প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতিকে। ২০২৪-এর লোকসভা বিপর্যয়েও যেখানে বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে অন্তত লিড বজায় রাখতে পেরেছিলেন অধীর, এবার সেই ‘শেষ দুর্গ’ও ধুলিসাৎ হয়ে গেল। ২০২১-এর নির্বাচনে এই কেন্দ্রে কংগ্রেস তৃতীয় হলেও এবার অধীর দ্বিতীয় স্থানে শেষ করলেন। বিদায়ী বিধায়ক সুব্রত মৈত্র নিজের জয়ের ধারা বজায় রাখলেন। তৃণমূল প্রার্থী তথা পুরসভার চেয়ারম্যান নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায় লড়াইয়ে থাকলেও তৃতীয় স্থানেই সন্তুষ্ট থাকলেন। তিন দশক পর ফের বিধানসভা ভোটের ময়দানে ফিরেছিলেন অধীর চৌধুরী। গত তিন দশকে মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে তাঁর নামই ছিল শেষ কথা। ১৯৯৯ সালে অসম্ভবকে ‘সম্ভব’ করেছিলেন তিনি। মাত্র এক বছরে কংগ্রেসকে তৃতীয় থেকে প্রথম স্থানে তুলে এনেছিলেন। প্রমথেশ মুখোপাধ্যায়ের মতো দাপুটে আরএসপি নেতাকে প্রায় এক লক্ষ ভোটে হারিয়ে শুরু হয়েছিল ‘রবিনহুড’ মিথের জয়যাত্রা। লোকসভায় টানা পাঁচবার জয়ের রেকর্ড গড়া অধীর ২০২৪-এ তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে ৮৫ হাজার ভোটে হেরে বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন। এবার নিজের মেজাজে বিধানসভা ভোটে লড়ে ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফল বলছে, অধীরের সেই ম্যাজিক আর কাজ করেনি। বহরমপুরের এই বিধানসভা আসনটি বিজেপির দখলেই রয়ে গেল। গত কয়েক বছরে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলেছে। ২০১৬ সালের পর থেকেই কংগ্রেসের একচ্ছত্র গড় মুর্শিদাবাদে থাবা বসাতে শুরু করেছিল তৃণমূল। ২০১৮-র পঞ্চায়েত ভোট থেকে শুরু করে ২০১৯-এর লোকসভা— ধাপে ধাপে জমি হারিয়েছে কংগ্রেস। ২০১৯-এর লোকসভায় অধীর জিতলেও ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছিল। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে গোটা রাজ্যে বাম-কংগ্রেস শূন্য হয়ে গেলেও বহরমপুর লোকসভার অন্তর্গত সাতটি বিধানসভার মধ্যে ছয়টি জিতেছিল তৃণমূল। একমাত্র বহরমপুর বিধানসভাটি জিতেছিলেন বিজেপির সুব্রত। সেই সময় কংগ্রেস প্রার্থী মনোজ চক্রবর্তী ছিলেন তৃতীয় স্থানে। এবার সেই কেন্দ্রে অধীর নিজে দাঁড়িয়েও বিজেপির বিজয়রথ থামাতে পারলেন না। প্রচারের ময়দান এবার অধীরের জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। একদা ছায়াসঙ্গী তথা তৃণমূল প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের কড়া ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। নাড়ুগোপাল প্রতিটি সভায় সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন, ‘নবাবি জমানার মতোই রবিনহুড-এর মিথও ভেসে গিয়েছে ভাগীরথীর জলে’। তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা শহরের অলিতে-গলিতে অধীরের প্রচারে বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই নেতাকে শুনতে হয়েছে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। এমনকি ভোট মেটার পরেও শহরের কুঞ্জপুর-সাইদাবাদ এলাকায় অধীর অনুগামীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে শাসকদলের বিরুদ্ধে। অধীরের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম স্বাদ ছিল পরাজয়। ১৯৯১ সালে নবগ্রাম আসনে তিনি সিপিএমের কাছে মাত্র দেড় হাজার ভোটে হেরেছিলেন। তবে ১৯৯৬-এ সেই কেন্দ্র থেকেই ২০ হাজার ভোটে জিতে প্রথমবার বিধানসভায় পা রাখেন। সে সময় ফৌজদারি মামলার জেরে এলাকাছাড়া হয়েও ক্যাসেটে রেকর্ড করা বক্তৃতার মাধ্যমে প্রচার করে জয়ের নজির গড়েছিলেন তিনি। ১৯৯৯-এ লোকসভায় জেতার পর বিধায়ক পদ ছেড়েছিলেন। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ফের বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে হারের তিক্ত স্বাদ পেতে হলো এই বর্ষীয়ান নেতাকে। রেল প্রতিমন্ত্রী থেকে শুরু করে লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা— দিল্লির অলিন্দে দাপিয়ে বেড়ানো অধীর এবার ঘরের মাঠেই কার্যত কোণঠাসা। তৃণমূল ও বিজেপির এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের চাপে পিষ্ট হয়েই অধীরের দুর্গের পতন হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-এ যে জয়ের ব্যবধান ৮০ হাজারে নেমে এসেছিল, ২০২৪-এ তা পরাজয়ে পরিণত হয়। এবার বিধানসভা উপনির্বাচনেও সেই হারের ধারা অব্যাহত থাকল। নির্বাচনের ময়দানে শান্ত স্বভাবের সুব্রত মৈত্র কোনও বিতর্কে না জড়িয়েই দ্বিতীয়বার বাজিমাত করলেন। অন্য দিকে, তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক জেলায় মজবুত হলেও বহরমপুর শহরে বিজেপির হিন্দু ভোট এবং কংগ্রেসের ক্ষয়িষ্ণু শক্তির লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসল পদ্ম শিবিরই। মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে অধীর-যুগ কি তবে সত্যিই অস্তাচলে? লোকসভার পর নিজের ‘সেফ জোন’ বিধানসভাতেও এই পরাজয় সেই প্রশ্নই উসকে দিল। তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়ল অধীরের শেষ রক্ষা কবচ। ফাইল ফটো।
তৃণমূলই ফিরছে ! মীরের মন্তব্যে, বিদ্ধ হাত শিবির, ফুঁসছেন অধীর