নয়া জামানা ডেস্ক : বুথফেরত সমীক্ষাকে স্রেফ ‘বিজেপির চক্রান্ত’ বলে উড়িয়ে দিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে এবং সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে এই কাল্পনিক সমীক্ষা করানো হয়েছে। বাংলায় তৃণমূল ২২৬টির বেশি আসনে জিতে অনায়াসে ক্ষমতায় ফিরছে বলে তিনি ১০০ শতাংশ নিশ্চিত। বৃহস্পতিবার এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় মমতা বলেন, ‘বিজেপি টাকা দিয়ে বুথফেরত সমীক্ষা দেখিয়েছে। আমরা ২২৬ ক্রস করব। ২৩০-ও পেয়ে যেতে পারি। মানুষ যে ভাবে ভোট দিয়েছেন, আমার পুরো ভরসা রয়েছে।’ একইসঙ্গে গণনাকেন্দ্রে ইভিএম কারচুপি রুখতে কর্মীদের অতন্দ্র প্রহরীর মতো রাত জেগে পাহারার নির্দেশ দিয়েছেন নেত্রী। রাজ্যে দ্বিতীয় দফার ভোট মিটতেই বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বুথফেরত সমীক্ষায় বিজেপির জয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। অধিকাংশ সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, গেরুয়া শিবির ম্যাজিক ফিগার ১৪৮ পেরিয়ে ১৫০-এর বেশি আসন পেতে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে সোচ্চার হন মমতা। তিনি অভিযোগ করেন, বুধবার বেলা ১টা ৮ মিনিটে বিজেপির সদর দফতর থেকে একটি সার্কুলার জারি করে সংবাদমাধ্যমকে নির্দিষ্ট ফলাফল দেখানোর জন্য বাধ্য করা হয়েছিল। নেত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘আমি আপনাদের নিশ্চিন্ত করে বলতে চাই, যেটা টিভিতে দেখাচ্ছে, গতকাল বেলা ১টা ৮ মিনিটে বিজেপির অফিস থেকে সেই সার্কুলার জারি করা হয়েছে। টাকা দিয়ে বলা হয়েছে ওটা দেখাতে। জোর করে সংবাদমাধ্যমকে এটা করতে বাধ্য করা হয়েছে।’ বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশের নেপথ্যে বিজেপি গভীর অর্থনৈতিক চক্রান্ত দেখছেন মমতা। তাঁর দাবি, শেয়ার বাজারে ধস নামা রুখতেই বিজেপি এই ‘শেষ খেলা’ খেলেছে। মমতার কথায়, ‘বিজেপি এত করেও মানুষের অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করতে পারল না। তাই সংবাদমাধ্যমকে দিয়ে ওরা শেষ খেলা খেলেছে। যাতে উল্টোপাল্টা বলে আমাদের কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়। আমার কাছে খবর আছে, শেয়ার মার্কেটকে সান্ত্বনা দিতে ওরা এটা করেছে।’ ভোটারদের সাহস ও ধৈর্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এত রোদের মধ্যেও, এত অত্যাচার সহ্য করেও আপনারা যে ভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন, তাতে আমরা কৃতজ্ঞ। আমার কর্মীদের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। ওঁরা প্রাণপণ লড়াই করেছে। অনেক অত্যাচার সহ্য করেছে। যাঁরা বাংলাকে জব্দ করতে চেয়েছিলেন, তাঁরা ভোটবাক্সে জব্দ হয়ে গিয়েছেন।’ নির্বাচন চলাকালীন কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের একাংশের ভূমিকা নিয়ে কড়া ভাষায় তোপ দেগেছেন তৃণমূলনেত্রী। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সরাসরি হস্তক্ষেপে বাহিনী বিজেপির ‘এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করেছে। মমতার দাবি, ভোটের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং স্থানীয় পুলিশের যৌথ অত্যাচার তৃণমূল কর্মীদের সহ্য করতে হয়েছে। নতুন নিযুক্ত পুলিশকর্মীরা নির্বিচারে মহিলা ও শিশুদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ। উদয়নারায়ণপুরে ভোট দিতে গিয়ে মৃত ব্যক্তির শোকাতুর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই পরিবারের পাশে আমরা থাকব। সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার নেই।’ ভাটপাড়া, জগদ্দল ও নোয়াপাড়ায় তৃণমূল কর্মীদের এজেন্ট হতে বাধা দেওয়া এবং ভবানীপুরে নিজের বাড়ির এলাকায় রাতভর তল্লাশি চালানোর অভিযোগ তুলে সরব হন তিনি। তাঁর ক্ষোভ, ‘আমাদের কর্মীদের মেরেছে যাতে এজেন্ট হতে না পারে। আমি দু’দিন ঘুমোইনি।’ ফলাফল ঘোষণার দিন কর্মীদের জন্য একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা জারি করেছেন মমতা। তাঁর আশঙ্কা, গণনাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সময় ইভিএম বদলে দেওয়া হতে পারে। কর্মীদের উদ্দেশে মমতার কড়া বার্তা, ‘গণনাকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। দরকারে আমিও আমার এলাকায় পাহারা দিতে নামব। প্রার্থীরা নিজে পাহারা দিন। রাত জাগুন। আমি যদি পারি, আপনারাও পারবেন। কারণ, গণনাকেন্দ্রে ইভিএম নিয়ে যাওয়ার সময় যন্ত্র বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাই এটা অবহেলে করবেন না।’ গণনার টেবিলে থাকা ভোট যাতে কম্পিউটারে তোলার সময় বিজেপির নামে চালিয়ে দেওয়া না হয়, সেদিকে বাজপাখির মতো নজর রাখতে বলেছেন তিনি। মমতার হুঁশিয়ারি, ‘আমি যত ক্ষণ সাংবাদিক বৈঠক করে না-বলব, তত ক্ষণ কেউ গণনার টেবিল ছাড়বেন না। গণনার সময় ঠায় বসে থাকবেন কেন্দ্রে। কাউকে শৌচালয়ে যাওয়ার জন্য বা খাবার খাওয়ার জন্য উঠতে হলেও দু’মিনিটের বেশি নয়। এমন কাউকে ওই সময়ে বসিয়ে যাবেন, যিনি বিশ্বস্ত। টাকা দিয়ে যাঁকে কেনা যায় না।’ মমতা যখন সমীক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করছেন, ঠিক তখনই বাংলার মানুষের ‘মৌনতা’র কথা স্বীকার করে পিছু হঠল বিখ্যাত সমীক্ষক সংস্থা অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া। সংস্থার প্রধান প্রদীপ গুপ্তা জানিয়েছেন, এবার তাঁরা বাংলার বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করবেন না। দীর্ঘ টালবাহানার পর তিনি সাফ জানান, বাংলার ৬০-৭০ শতাংশ ভোটার নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে চাননি। স্যাম্পল সাইজ পর্যাপ্ত না হওয়ায় কোনও ভুল তথ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে চান না। প্রদীপবাবুর বক্তব্য, ‘এমন কোনও তথ্য আমরা প্রকাশ করতে চাই না যাতে আমাদের নিজেদেরই আস্থা নেই।’ ২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলার ক্ষেত্রে বারবার বুথফেরত সমীক্ষা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা ও মহিলা ভোটারদের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে অধিকাংশ সংস্থা। এই আবহে মমতার এই রণংদেহি মনোভাব এবং অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার পিছু হঠা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত বাংলা কার দখলে থাকে, তার উত্তর লুকিয়ে বাক্সবন্দি ইভিএমে, আর তা জানা যাবে আগামী সোমবার। ছবি ভিডিও থেকে নেওয়া ।
“আমার নাম আছে, তবুও কেন ভোট দিতে পারব না?” ৯ জনের আক্ষেপের সাক্ষী থাকলো পোলিং স্টেশন