ব্রেকিং
  • Home /
  • মহানগর /
  • বিচারক নিগ্রহ : তদন্তে নামছে এনআইএ, সুপ্রিম শোকজ রাজ্যের ডিজি-মুখ্যসচিবকে

বিচারক নিগ্রহ : তদন্তে নামছে এনআইএ, সুপ্রিম শোকজ রাজ্যের ডিজি-মুখ্যসচিবকে

নয়া জামানা ডেস্ক : ‘এটি বিচারকদের ভয় দেখানোর একটা স্পষ্ট চেষ্টাই শুধু নয়, এটি আদালতকেও চ্যালেঞ্জ করা। এটি কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। বরং মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য ছিল বিচারকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং বাকি থাকা....

বিচারক নিগ্রহ : তদন্তে নামছে এনআইএ, সুপ্রিম শোকজ রাজ্যের ডিজি-মুখ্যসচিবকে

নয়া জামানা ডেস্ক : ‘এটি বিচারকদের ভয় দেখানোর একটা স্পষ্ট চেষ্টাই শুধু নয়, এটি আদালতকেও চ্যালেঞ্জ....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


নয়া জামানা ডেস্ক : ‘এটি বিচারকদের ভয় দেখানোর একটা স্পষ্ট চেষ্টাই শুধু নয়, এটি আদালতকেও চ্যালেঞ্জ করা। এটি কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। বরং মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য ছিল বিচারকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং বাকি থাকা মামলাগুলিতে আপত্তি নিষ্পত্তির গোটা প্রক্রিয়াই বন্ধ করে দেওয়া।’ মালদহের কালিয়াচকে বিচারকদের আটকে রেখে ‘তাণ্ডব’ চালানোর ঘটনায় এ ভাবেই বৃহস্পতিবার রাজ্য প্রশাসনকে তুলোধোনা করল দেশের শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চের এই কড়া বার্তার পরেই নড়েচড়ে বসেছে নির্বাচন কমিশন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের রেশ ধরে মালদহ কাণ্ডে এনআইএ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। একই সঙ্গে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং মালদহের জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে শো-কজ করেছে সর্বোচ্চ আদালত। আগামী সোমবার, ৬ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। ওই দিন ভার্চুয়াল মাধ্যমে রাজ্যের শীর্ষ আধিকারিকদের হাজির থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে বুধবার রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল মালদহের মোথাবাড়ি এবং সুজাপুর চত্বর। বিশেষ করে কালিয়াচক-২ নম্বর ব্লকের অফিসে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট বা এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত সাত জন বিচারককে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। পরিস্থিতি বিচার করে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল বিষয়টি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টকে জানান। বৃহস্পতিবার সকালে মামলার গুরুত্ব বুঝে তড়িঘড়ি শুনানির ব্যবস্থা করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। শুনানিতে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে নজিরবিহীন ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

বিচারকদের নিরাপত্তা দিতে না পারায় রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে রীতিমতো খড়্গহস্ত হয় শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছিলাম, এসআইআর-এ বিবেচনাধীন নামের নিষ্পত্তি করার কাজে নিযুক্ত বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’ জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলেও জেলা স্তরের এই দুই শীর্ষ আধিকারিক ঘটনাস্থলে পৌঁছোননি। এমনকি হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিজে ফোন করার পরেও রাজ্যের ডিজি বা স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি এবং হোয়াটসঅ্যাপেও তাঁর নম্বর পাওয়া যায়নি বলে ক্ষোভ উগরে দেয় আদালত।

প্রশাসনিক এই স্থবিরতায় বিস্ময় প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি কান্ত বলেন, ‘এই ঘটনা রাজ্য প্রশাসনের সম্পূর্ণ ব্যর্থতাকে প্রকাশ করে। মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের ডিজি এবং এসপি-র আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও তাঁরা কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কেন ব্যর্থ হয়েছেন, তা তাঁদের ব্যাখ্যা করতে হবে।’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, প্রশাসনের এই উদাসীনতা আসলে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার ওপর এক চরম আঘাত। এর পরেই সিবিআই বা এনআইএ-র মতো কোনও স্বাধীন সংস্থাকে দিয়ে তদন্তের পথ প্রশস্ত করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থানের পরেই দিল্লিতে রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালার সঙ্গে বৈঠকে বসেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। সেখানেও ক্ষোভের মুখে পড়েন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত এবং মালদহের এসপি অনুপম সিংহ। কমিশন সূত্রে খবর, ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে কেন দেরি হল, তা নিয়ে এসপি-কে তীব্র ভর্ৎসনা করেন জ্ঞানেশ কুমার। এসপি-র বদলে কেন এএসপি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নে সরব হয় কমিশন। এমনকি ডিজির মতো অভিজ্ঞ অফিসারের নেতৃত্বাধীন পুলিশ বাহিনী কেন শুরুতেই গণ্ডগোল রুখতে পারল না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এই ঘটনা কোনও ভাবেই লঘু করে দেখার সুযোগ নেই।

তদন্তের স্বার্থে সিবিআই বা এনআইএ-র মতো ‘স্বাধীন’ সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ার যে নির্দেশ সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছিল, তা পালন করতে কালক্ষেপ করেনি নির্বাচন কমিশন। মালদহ কাণ্ডের তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়েছে এনআইএ-র হাতে। পাশাপাশি, বিচারকদের নিরাপত্তা নিয়েও একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে আদালত। এখন থেকে এসআইআর সংক্রান্ত কাজ যেখানে হবে, সেখানে এক সঙ্গে তিন থেকে পাঁচ জনের বেশি প্রবেশ করতে পারবেন না। বিচারকদের বাসভবন এবং তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশনকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাগত ঝুঁকি পর্যালোচনা করে বিচারকদের জন্য অভেদ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে।

রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা নিয়েও বৃহস্পতিবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিশন। কলকাতার ভবানীপুরে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন পেশকে কেন্দ্র করে অশান্তি এবং সিইও দফতরের সামনে বিক্ষোভ নিয়ে কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দের কাজেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। কমিশনারকে লক্ষ্য করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘একজন আইপিএস অফিসার হয়ে কলকাতা সামলাতে পারছেন না! আপনাকে কি প্রশিক্ষণ দিতে হবে?’ এই মন্তব্যে কার্যত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, রাজ্যের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে।

অন্যদিকে মালদহের ঘটনায় পুলিশি তৎপরতাও শুরু হয়েছে। ব্লক অফিসে হামলার অভিযোগে মোথাবাড়ির আইএসএফ প্রার্থী মৌলানা শাহজাহান আলিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতের দাবি, তিনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার এবং ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। শাহজাহান ছাড়াও এই ঘটনায় আরও ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের বৃহস্পতিবার মালদহ জেলা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন। গ্রেফতারি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হলেও পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মালদহের এই ঘটনা নিছক কোনও জনরোষ নয়, বরং এটি একটি ‘ফৌজদারি অপরাধ’। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সাফ জানিয়েছেন, ‘আমরা কাউকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বা বিচারকদের মনে ভয় তৈরি করার মাধ্যমে কাজে বাধা দিতে দেব না।’ বিচারকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। বিশেষ করে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের গতিবিধি এবং তাঁদের আবাসনকে কড়া নজরদারিতে রাখার কথা বলা হয়েছে।

সোমবারের শুনানির গুরুত্ব এখন অপরিসীম। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এসআইআর-এর কাজ কোনও অবস্থাতেই থমকে যাবে না। বরং আরও কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা এই গণ-বিক্ষোভ সামাল দিতে কেন ব্যর্থ হলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট চেয়েছে আদালত। হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির পাঠানো চিঠিতে যে সব বিস্ফোরক অভিযোগ রয়েছে, তার ভিত্তিতে কেন এই আধিকারিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সবমিলিয়ে, আগামী সোমবারের শুনানিতে রাজ্য প্রশাসনের হলফনামা এবং তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টের দিকেই এখন নজর ওয়াকিবহাল মহলের।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর