নয়া জামানা ডেস্ক : নোটবন্দির সেই অভিশপ্ত দিনগুলোই বদলে দিয়েছিল বাংলার নারী উন্নয়নের অভিমুখ। সিন্দুকবন্দি সঞ্চয় যখন রাতারাতি অচল কাগজে পরিণত হয়েছিল, গৃহকর্ত্রীদের সেই অসহায়তাই জন্ম দিয়েছিল আজকের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের। বুধবার মুর্শিদাবাদের বড়ঞায় এক নির্বাচনী জনসভায় দাঁড়িয়ে এই গোপন কথা ফাঁস করলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, এটি কেবল একটি সরকারি প্রকল্প নয়, বরং বাংলার মা-বোনেদের জন্য তাঁর দেওয়া এক বিশেষ ‘উপহার’।
জনসভার ভিড়ে দাঁড়িয়ে মমতা এদিন সরাসরি নিজের পরিবারের উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি জানান, নোটবন্দির সময় তাঁর বাড়িতেই এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা লতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কাছেই থাকেন। সেই সময়ের স্মৃতি হাতড়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নোটবন্দির সময় বিরোধিতা করেছিলাম। বলেছিলাম, এতে মানুষের ক্ষতি হবে। আমার কাছে সেই সময় একদিন অভিষেকের মা ছুটে এল। ও আমার কাছেই থাকে। আমাকে বলল, ‘দিদি, দিদি! ৫০০ টাকা দেবে?’ আমি বললাম কেন? ও বলল, ‘সব টাকা তো জমা করে দিতে হবে। এ টাকা তো চলবে না। তা হলে আমি বাজার করব কী করে?’’ মমতা আরও বলেন, ‘মা-বোনেদের দুঃসময়ের পুঁজি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একটি মেয়ে সে বেঙ্গালুরুতে থাকে। তার বাড়ির একজন আমাদের কাছে থাকে। সে-ও বলেছিল, ১০০টা টাকা দেবে? আমি সে দিনই ঠিক করেছিলাম লক্ষ্মীর ভান্ডারের কথা। লক্ষ্মীর ভান্ডার মা বোনেদের উপহার।’ মুখ্যমন্ত্রী এদিন আবেগতাড়িত হয়ে জানান, তাঁর নিজেরও একটি মাটির ভাঁড় আছে। সেখানে তিনি খুচরো টাকা জমান। ‘আমার নিজেরও লক্ষ্মীর ভান্ডার আছে। তাতে পাঁচ টাকা, দশ টাকা করে জমা করি। কালীপুজোর সময় হলে একটা কিছু মাকে দিই।’
এদিনের বক্তৃতায় মুর্শিদাবাদের আবেগ ছুঁতে ঋত্বিক ঘটক এবং মহাশ্বেতা দেবীর প্রসঙ্গ তোলেন মমতা। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ঋত্বিক ঘটক মারা গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী আমাকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। সেটি আজও সংগ্রহে রেখে দিয়েছি। কোনও দিন ভুলতে পারব না মহাশ্বেতা দেবীকে। তিনি আমার মায়ের মতো। তিনি আমার রক্তে মিশে আছেন।’ জেলার খাদ্য সংস্কৃতির প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত ছানাবড়া। এই বড় বড়। একটা খেলে আর ভাত খেতে হবে না।’ তবে জেলার প্রধান সমস্যা ভাগীরথীর ভাঙন নিয়ে কেন্দ্রকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করতে ছাড়েননি তিনি। কেন্দ্রীয় উদাসীনতার অভিযোগ তুলে মমতার প্রতিশ্রুতি, ‘একটা কাজ যদি করত।’ তিনি একটু সময় চেয়ে নিয়েছেন এবং রাজ্যের তরফে ড্রেজিং ও সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন।
মুর্শিদাবাদের মায়েদের অতিরিক্ত ‘শান্ত’ থাকা নিয়েও এদিন অনুযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘মুর্শিদাবাদের মায়েরা এত শান্ত হলে কী করে হবে! আপনাদের এত নাম কাটছে ভোটার তালিকা থেকে!’ রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান দিয়ে তিনি জানান, এখন আর রেশনে আধভাঙা চাল দেওয়া হয় না। উন্নত মানের চাল চাষিদের থেকে সরাসরি কেনা হচ্ছে। আলুচাষিদের অভয় দিয়ে তাঁর বার্তা, মিড ডে মিলের জন্য সরকার আলু কিনবে এবং লোকসান হলে তার ক্ষতিপূরণও দেবে। ১০০ দিনের কাজের বকেয়া নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মমতা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা মহাত্মা গান্ধীর নামে সেই প্রকল্প শুরু করেছে। আগামিদিনে রাজ্যের কারও কাঁচা বাড়ি রাখব না। সব পাকা বাড়ি হবে। পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছোবে বাড়ি বাড়ি।’
বিজেপিকে কড়া আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী এদিন অনুপ্রবেশকারী ইস্যু ও আইটিবিপি তল্লাশি নিয়ে সরব হন। তিনি বলেন, ‘তুমি চুপি চুপি ছুপারুস্তমের মতো লোক ঢোকাও নিজের স্বার্থে।’ সম্প্রতি আইটিবিটি বা কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের গতিবিধি নিয়ে তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘পরশুদিন নাকি আইটিবিটির ডিজি এসেছিল কলকাতায়। বলেছে মেয়েদের পরীক্ষা করে দেখা হবে। চেক করা হবে। আমি বললাম, বাংলা কিন্ত অন্যরকম। মেয়েদের দিয়েও যদি গায়ে হাত দিয়ে কোনও রকম অসম্মান করো, তারা কিন্তু মুখ বুজে থাকবে না। প্রতিবাদ করবে।’ ভোটারদের উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘প্রার্থী কে ভুলে যান। এই জোড়াফুলটাকে মনে রাখবেন। জোড়াফুল জিতলে আমাদের সরকার আসবে। আপনার লক্ষ্মীর ভান্ডার চলবে। কন্যাশ্রী চলবে। ঐক্যশ্রী চলবে। শিক্ষাশ্রী চলবে। কৃষক বন্ধু চলবে। সমস্ত উন্নয়ন চলবে।’
বিরোধীদের চক্রান্ত ও ভোটের আগে ধরপাকড় নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘বাইরের সব নেতা এখানে দখল করে বসে আছে। ভোটের আগের দিন কাউকে কাউকে দিয়ে গ্রেফতার করারও চেষ্টা করবে। তাই সব চেঞ্জ করেছে। তৃণমূল কিন্তু মাথানত করতে জানে না। লড়াই করে ছিনিয়ে নিতে জানে।’ সাম্প্রদায়িক তাস খেলে ভোট ভাগাভাগির চেষ্টাকেও তিনি কটাক্ষ করেন। তাঁর কথায়, ‘কেউ কেউ কমিউনাল কথা বলে ভোট কাটতে চেষ্টা করবে। একটা ভোটও ভাগাভাগি করতে দেবেন না। এটা বিজেপির খেলা। টাকা দিয়ে কাউকে কাউকে কিনে নেয়। ইলেকশনের আগে দেয় ক্যাশ। তার পর দেয় গ্যাস।’ পরিশেষে নিজেকে সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের সৈনিক হিসেবে তুলে ধরে মমতার মন্তব্য, ‘আসলে আমাকে ওরা খুব ভয় পায়। সবসময় আমাকে টার্গেট করে। সরকারে থেকেও যেন বিরোধী হয়ে গিয়েছি। আমরা ভাঙি তা-ও মচকাই না। লড়তে জানি।’ বাংলার শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই শান্তির বাংলাকে অশান্ত হতে দেবেন না।’