নয়া জামানা ডেস্ক : ‘দিল্লির জমিদারেরা আমার হাত থেকে সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। এটা মাত্র এক মাসের জন্য। কিন্তু মনে রাখবেন, যতই করো চেষ্টা, মিটবে নাকো তেষ্টা। তৃণমূল আসছে, তৃণমূল আসবেই।’ সোমবার মেদিনীপুরের মাটি থেকে এভাবেই বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনকে একযোগে নিশানা করলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ডেবরা, বেলদা ও পাঁশকুড়ায় ঝোড়ো প্রচার সেরে এদিন তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, বিধানসভা ভোটে জয়ের বিষয়ে তিনি ১০০ শতাংশ প্রত্যয়ী। একইসঙ্গে তাঁর হুঙ্কার, ‘ভোট হয়ে গেলে পশ্চিমবঙ্গে জিতে সকলকে এক করে সারা দেশের মানুষকে নিয়ে দিল্লি দখল করতে হবে।’
এদিন জনসভার শুরু থেকেই উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ইস্যুতে কেন্দ্রের মোদী সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘দেশে বেকারের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। আর বাংলায় আমরা ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমিয়েছি। ২ কোটি ছেলেমেয়েকে চাকরি দিয়েছি। আগামী দিনে আরও দেব।’ যুবকদের স্বনির্ভর করতে ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘যুবসাথী যুবকদের পকেটখরচ। আমরা চাই না কাউকে কারও কাছে হাত পাততে হোক। ওরা নগ্ন ভাষায় কথা বলে, আমরা সৌজন্যের ভাষায় কথা বলি।’ বেকারত্ব ঘোচানোর লক্ষে সরকারের এই লড়াই জারি থাকবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
বিজেপিকে ‘বাংলাবিরোধী’ ও ‘মহিলাবিরোধী’ তকমা দিয়ে মমতা বলেন, ‘এরা মহিলাদের পছন্দ করে না। এরা অ্যান্টি উইমেন। সবচেয়ে বেশি ভোট বাদ দিয়েছে মা-বোনেদের।’ এসআইআর-এর লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটারদের যে অসম্মান করা হয়েছে, তার বদলা মানুষ এবার ব্যালটেই নেবে বলে দাবি করেন তিনি। ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া প্রসঙ্গে নেত্রীর সরাসরি তোপ, ‘বাদ দিয়েছিল ১ কোটি ২০ লক্ষের নাম। নির্বাচন কমিশন বলার আগেই বিজেপি বলে দিয়েছিল। তার রেকর্ড তো সকলেই দেখেছেন। লজিস্টিকাল ডিসক্রিপেন্সিতে আছে ৬০ লক্ষ। তার অন্তত ৫০ শতাংশও যদি নাম উঠে থাকে, তার কৃতিত্ব অবশ্যই আমার কোর্টে যাওয়ার জন্য। কারণ, আমি নিজে গিয়েছিলাম সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। লড়াই করেছিলাম।’ যাঁদের নাম কাটা গিয়েছে, তাঁদের অনলাইনে আবেদন করার পরামর্শ দিয়ে দলের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিজেপির খবরদারিকেও এদিন কড়া ভাষায় বিঁধেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রশ্ন, ‘বাংলার খাবারের উপরে আপনাদের কিসের এত হ্যাংলামি আর নোংরামি! মাছ খাবে না, মাংস খাবে না, ডিম খাবে না। তা কি ওদের মাথা খাবে!’ তিনি সতর্কবার্তার সুরে বলেন, ‘একটা আসনে আমরা হারলে বিজেপি আপনার মাছ খাওয়া বন্ধ করবে। অসম্মান করবে। বিজেপি যেখানে আছে, সেখানে মাছ খেতে দেয় না। মাছের দোকান বন্ধ। মাংসের দোকান বন্ধ। ওরা বড় অন্ধ।’ ভিনরাজ্যে গিয়ে বাংলায় কথা বললে বাঙালিদের হোটেলে থাকতে দেওয়া হয় না বা পিটিয়ে খুন করা হয় বলেও এদিন অভিযোগ তোলেন তিনি।
মেদিনীপুরের আবেগ ও ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাতঙ্গিনী হাজরা এবং ক্ষুদিরাম বসুর নাম বারবার উঠে আসে মমতার বক্তৃতায়। অমিত শাহের মিছিল থেকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘মেদিনীপুর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জেলা। তাঁর মতো মানুষ পেয়েছিলাম বলে শিক্ষার হাতেখড়ি আমরা শিখেছিলাম এই মেদিনীপুরের মাটি থেকে। এরা বিদ্যাসাগরকে সম্মান দেয় না। এরা মাতঙ্গিনীর নাম উল্টো বলে। এরা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বঙ্কিমদা বলে। এরা রাজা রামমোহন রায়কে, ক্ষুদিরামকে সম্মান দেয় না। আমরা দিই। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিজেপি কোথায় ছিল? জন্মেছিল? জন্মই হয়নি তার। সে তো ইংরেজদের কাছে মাথা নত করে পালিয়ে গিয়েছিল।’
এদিন জনসভা থেকে বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে মমতা বলেন, ‘আপনারা চান লক্ষ্মীর ভান্ডার চলুক! কোনো ভেদাভেদ নেই। ভাববেন না সিরাজ খান সংখ্যালঘু। আমার কাছে সংখ্যালঘু, মহিলা, তফসিলি— সকলেই থাকবে। সংখ্যালঘুরা কি প্রশ্ন করেছেন, মমতা ব্রাহ্মণের ঘরের মেয়ে, তাঁকে কেন মুখ্যমন্ত্রী করা হবে? করেননি। মুসলিমকে প্রার্থী করা হলে হিন্দুরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। তা হলে আমার অসম্মান হবে। সব ক’টি আসন গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখবেন, সরকারটা কিন্তু আমরাই গড়ব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিজেপি ধর্ম মানে না। এরা বকধার্মিক। ধর্মকে বিক্রি করে। আমরা ধর্মকে ঘরে রাখি, সম্মান করি। এরা ধর্ম বেচে খায়। আর আমরা মানবিকতার জন্ম দিই। এটাই ওদের সঙ্গে আমাদের তফাত।’
কৃষকদের প্রতি বিশেষ বার্তা দিয়ে মমতা বলেন, ‘সাড়ে পাঁচ লক্ষ পুকুর কাটা হয়েছে। ডেবরায় আসতে আসতে দেখছিলাম যেন সবুজের মখমল পাতা আছে। এত সুন্দর ফসল ফলেছে। কৃষকদের দু’বারে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। যার এক কাঠা জমি আছে, সে-ই চার হাজার টাকা পায় বছরে দু’বার। ভাগচাষিরাও ২০০০ টাকা করে বছরে দু’বার পাবেন।’ অন্যদিকে, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়িত না হওয়ার জন্য কেন্দ্রকে দায়ী করে তিনি জানান, দীর্ঘ দিন দিল্লির জমিদারদের কাছে আবেদন জানালেও কেন্দ্রীয় সরকার করে দেয়নি। রাজ্য সরকার দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়ে এই উদ্যোগ নিয়েছে, যা রূপায়িত হলে পাঁশকুড়াও উপকৃত হবে।
বক্তব্যের শেষে ভোটারদের সতর্ক করে তৃণমূলনেত্রীর আবেদন, ‘ভোটের আগে ওরা ক্যাশ দেয়, তার পর দেয় গ্যাস। এক মাস জ্বলবে, তার পর গ্যাস ফুরিয়ে যাবে। পেট্রলও পাবেন না। তাই কোনো কুৎসা বা অপপ্রচারে কান দেবেন না। মা-বোনেরা ওই দিন রান্না না করে ভোটবাক্স পাহারা দেবেন। গণনার দিন পাহারা দেবেন।’ তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ‘যতই করো চক্রান্ত, সব হবে ব্যর্থ। যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা। তৃণমূল জিতবে বাংলা। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যৌবন জিতবে বাংলা।’ গণতন্ত্র রক্ষার এই যুদ্ধে মেদিনীপুরের মানুষকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েই সভা শেষ করেন তিনি।