রবিন মুরমু, নয়া জামানা, দক্ষিণ দিনাজপুর: হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতে এবং নব জোয়ারকে নেট দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে আনতে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ত্রিমোহিনী প্রতাপ চন্দ্র উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের রাজকিশোর মঞ্চে রবিবার অনুষ্ঠিত হলো যাত্রাপালা দেবী সুলতানা। ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত এবং শরৎচন্দ্র রায় নির্দেশনায় একঝাঁক কলাকোশলী শিল্পীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এবং মহড়া ও অনুশীলন চর্চা শেষে গত রবিবার এই যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়। নেট দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাওয়া সামাজিক সংস্কৃতিকে এবং নাট্যচর্চা কে ফিরিয়ে আনতে এলাকার নাট্য ও যাত্রা প্রেমী শিল্পীদের দীর্ঘ প্রয়াসে এই যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়। এই যাত্রাপালা অনুষ্ঠানকে ঘিরে সন্ধ্যের পর থেকেই ত্রিমোহিনীসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের পুরুষ ও মহিলারা ভিড় জমাতে থাকেন। দীর্ঘ কয়েক দশক পর যাত্রাপালা উপভোগ করতে নিজ নিজ আসনে জায়গা দখল করে নেন দর্শকেরা। এদিন এই যাত্রাপালা শুরু হতেই তীক্ষ্ণ এক নজরে দর্শকেরা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন চরিত্রে থাকা শিল্পীদের যাত্রাপালা উপভোগ করেন। প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে নিজ নিজ দায়িত্বে থাকা শিল্পীরা দায়িত্ব এবং নিষ্ঠার সাথে দর্শকদের মধ্যে তাদের অভিনয় সুন্দর করে পরিবেশন করার লক্ষ্যে মঞ্চে নিজ নিজ চরিত্রের অভিনয় গুলি পরিবেশন করেন। স্বাভাবিক কারণেই কোন শিল্পী পিছিয়ে ছিল না। নিজেদের অভিনয়ের জায়গা ঠিকঠাক ভাবে ধরে রাখার জন্য কোন শিল্পী তাদের অঙ্গ-ভঙ্গিতে ঘাটতি রাখেননি। ‘দেবী সুলতানা’ যাত্রাপালা শুরু করার পূর্বে বর্ষীয়ান যাত্রা শিল্পী কমল ঘোষ,বিদ্যুৎ বিশ্বাস, রিনা মাহালি, নৃপেন্দ্রনাথ সরকার, বিমল মহন্ত সহ এলাকার প্রাক্তন যাত্রা শিল্পীদের সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবী এবং বঙ্গরত্না তাপস কুমার চক্রবর্তী, সুনীল সরকারসহ এলাকার বিশিষ্ট জনেরা। রাজা উদয়নারায়ণ ভূমিকায় অভিনয় করেন বীরেন্দ্রনাথ মহন্ত, রানী চরিত্রে বীথিকা ঘোষ, রাজকন্যা মনীষা শীল ধুজটি মঙ্গল সেনাপতি বিপুল কৃষ্ণ ঘোষ,বর্ণালী ঘোষ দেবী,মোদক বিশ্বাস এবং রামপ্রসাদ চক্রবর্তী, চন্দন চৌধুরী সহ এক ঝাক শিল্পী তাহাদের বিভিন্ন চরিত্রের অভিনয়ে কোথাও ঘাটতি রাখেননি। স্বাভাবিক কারণেই শিল্পীদের অভিনয়ে সন্তুষ্ট হয়ে দর্শকরা তাদের তীক্ষ্ণ চোখের নজরে এক পলকও চোখের পাতা না নাড়িয়ে মনোযোগ সহকারে যাত্রা শিল্পীদের অভিনয় উপভোগ করেন। এই যাত্রা অনুষ্ঠানে সুন্দরভাবে দর্শকদের মন জয় করে সঞ্চালনা করেন বৈশাখী সেন। এলাকার নাট্য এবং যাত্রা শিল্পী রামপ্রসাদ চক্রবর্তী বীরেন্দ্রনাথ মাহাতো এবং উদয় প্রামাণিকরা বলেন যে, সুনামের সাথে কয়েক দশক পূর্বে ত্রিমোহিনীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শিল্পীদের এক সময় সুনামের সাথে নাটক এবং যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতো ত্রিমোহিনীতে। বর্তমানে নেট দুনিয়ার দাপটে আজ যুব সমাজ সেসব সংস্কৃতিকে ভুলে গেছে। এলাকা থেকে হারিয়ে যাওয়া নাটক এবং যাত্রাকে পুনরুদ্ধার করতে এবং পুরনো সেই স্মৃতিকে আবার ফিরিয়ে আনতে ত্রিমোহিনীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার নাটক এবং যাত্রা শিল্পীরা উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে পুরনো সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা নিয়ে নব প্রজন্মের হাতে নাটক এবং যাত্রার সংস্কৃতি চর্চা কে তাদের হাতে আমরা তুলে দিতে চাই। সেই কারণেই এই এই উদ্যোগ। প্রায় তিন দশকের পর ত্রিমোহিনী প্রতাপ চন্দ্র উচ্চ মাধ্যমিক প্রাঙ্গণ পুনরায় সংস্কৃতি চর্চাকে ফিরিয়ে আনার এই প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ত্রিমোহিনী সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং নাট্য ও যাত্রা প্রেমি জনসাধারণ। পরবর্তীতে যাতে পুনরায় ত্রিমোহিনী রাজকিশোর মঞ্চে নাটক এবং যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয় তার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন এলাকার সংস্কৃতি প্রেমী নাগরিকরা। এদিনের যাত্রাপালা অনুষ্ঠানে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের আসন থেকে এক ধাপও সরে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত যাত্রা পালা উপভোগ করেন দর্শকেরা।