নয়া জামানা ডেস্ক : হলদিয়ার রাজপথে গেরুয়া আবির আর জনসমুদ্রের গর্জন। সঙ্গে হেভিওয়েট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আর দলের পোড়খাওয়া সেনাপতি। সোমবার দুপুরে হলদিয়ার মহকুমাশাসকের দফতরে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে আত্মবিশ্বাসে ফুটছেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের ভোট তাঁর কাছে এখন ‘জলভাত’। স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। বিদায়ী বিধায়কের সাফ কথা, ২০২১ সালের সেই কঠিন পাটিগণিত এখন অতীত। পাটিগণিতের জটিল হিসেব মুছে দিয়ে এবার শুধুই জয়ের লক্ষ্য। একই সঙ্গে তাঁর হুঙ্কার, এবার লক্ষ্য খাস কলকাতা। মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুক ভবানীপুর জয় করাও এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। মনোনয়ন পেশের মিছিলে শুভেন্দুর সঙ্গী হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং খড়্গপুর সদরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ। রোড শো-তে মানুষের ঢল দেখে উচ্ছ্বসিত শুভেন্দু বলেন, ‘ধর্মেন্দ্রজি রোড শো দেখে বলছিলেন, ‘ইস বার তিন গুণ হোগা।’ আসলে লোক চাইছে এখনই গিয়ে ইভিএমের বোতাম টিপে দিতে। মনে হচ্ছে যেন আগামিকালই ভোট। মানুষ আর এক মুহূর্ত অপশাসন চাইছেন না।’ হলদিয়ার কদমতলায় ‘বিজয় সংকল্প সভা’ সেরে মনোনয়ন জমা দিয়ে শুভেন্দু স্পষ্ট করে দেন, নন্দীগ্রামে তাঁর জয় নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কেন নন্দীগ্রাম এবার সহজ? তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন শিশির-পুত্র। শুভেন্দুর দাবি, গত বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটারদের এনআরসি আর সিএএ নিয়ে ভুল বুঝিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘২০২১ সালে ভোটের পাটিগণিতের হিসাবে নন্দীগ্রাম ‘টাফ’ ছিল। তখন নন্দীগ্রামে ৬৪ হাজার মুসলিম ভোট ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের ভুল বুঝিয়েছিলেন। তিনি সিএএ-কে এনআরসি বলেছিলেন। এখন মুসলিমরা বুঝে গিয়েছেন। তাঁরা এ-ও বুঝে গিয়েছেন, মোদীজি আছেন। অতএব সুশাসন-সুরক্ষা তাঁরা পাবেন। মুসলিমরা ওঁদের চক্করে আর পড়ছেন না। আর হিন্দুরা আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই নন্দীগ্রাম এখন আরও সহজ।’ তবে শুধু নন্দীগ্রাম নয়, শুভেন্দুর তোপ এবার সরাসরি ভবানীপুর নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডেরায় দাঁড়িয়ে তাঁকে হারানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন বিরোধী দলনেতা। শুভেন্দুর দাবি, ‘এসআইআরের পরে ভবানীপুর তো বিজেপির হয়েই গিয়েছে।’ তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০১৪ সালে মোদী হাওয়ায় দক্ষিণ কলকাতায় তথাগত রায় যখন প্রার্থী হয়েছিলেন, তখন ভবানীপুরে বিজেপি ২ হাজার ভোটের লিড পেয়েছিল। শুভেন্দুর আক্রমণ, ‘ওখানে অনুপ্রবেশকারী, ভুয়ো ভোটারদের দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটে জিততেন। এসআইআরের পর আর সেটা সম্ভব নয়।’ এবারের নির্বাচনে শুভেন্দুকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে বিজেপির রণকৌশল। রবিবার মুরলীধর সেন লেনে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে শুভেন্দুর হাতে প্রতীক তুলে দিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। যা কার্যত নজিরবিহীন। বিজেপি বুঝিয়ে দিয়েছে, এ রাজ্যে শুভেন্দুই তাদের প্রধান মুখ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও যে তাঁকে পূর্ণ ভরসা দিচ্ছে, তার প্রমাণ ধর্মেন্দ্র প্রধানের উপস্থিতি। এমনকি ২ এপ্রিল ভবানীপুরে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় শুভেন্দুর পাশে থাকতে পারেন খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুভেন্দুর লক্ষ্য এখন সুদূরপ্রসারী। আগামী ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি নন্দীগ্রাম ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মাটি কামড়ে পড়ে থাকবেন। প্রথম দফার ভোট মিটলেই ২৪ তারিখ সকাল থেকে তিনি ডেরা বাঁধবেন কলকাতায়। তাঁর কথায়, ‘তখন থেকে ভবানীপুরে থাকব। ২৯ তারিখে মমতাকে হারানোর কাজ শেষ করে স্ট্রং রুম সিল করে ভবানীপুর ছাড়ব। তার পর ৪ তারিখ দেখা হবে।’ অর্থাৎ ভোটের ফল বেরোনোর আগেই জয়ের আগাম বার্তা দিয়ে রাখলেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর— লড়াইটা এখন স্রেফ অধিকারীর মানরক্ষার নয়, বরং তৃণমূল নেত্রীকে তাঁর খাসতালুকে চ্যালেঞ্জ জানানোর। ধর্মেন্দ্র প্রধান থেকে দিলীপ ঘোষ, সোমবারের মিছিলে শুভেন্দুর পাশে দাঁড়িয়ে বিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্ট বার্তা দিল, এবার বাংলা দখলের লড়াইয়ে শুভেন্দুই তাঁদের সেনাপতি। মমতা বনাম শুভেন্দু লড়াইয়ে ভবানীপুর এখন সরগরম। শেষ হাসি কে হাসবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তুঙ্গে চর্চা। ৪ জুন দিনটিই এখন সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।