নয়া জামানা, কলকাতা : নিজের ঘরোয়া দুর্গ রক্ষায় এবার একেবারে কর্পোরেট কায়দায় কোমর বেঁধে নামল তৃণমূল কংগ্রেস। সশরীরে প্রার্থীকে সব সময় পাওয়া সম্ভব নয়, তাই ভোটারদের মন জিততে ভবানীপুরের অলিতে-গলিতে বসছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ ‘ফোটো বুথ’। বিধানসভা নির্বাচনের এই হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে নারাজ শাসকদল। ঘরের মেয়ের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হয়ে সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়াই এখন জোড়াফুল শিবিরের নয়া তুরুপের তাস। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে এ হেন গ্ল্যামারাস প্রচার কৌশল এর আগে বিশেষ দেখা যায়নি বলেই মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। সাধারণত বড় মাপের ফিল্মি অ্যাওয়ার্ড শো, জমকালো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান কিংবা বিয়েবাড়ির মতো সামাজিক অনুষ্ঠানেই এমন ফোটো কর্নার বা বুথ দেখা যায়। কিন্তু রাজনীতির তপ্ত আঙিনায় আমজনতাকে প্রার্থীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সুযোগ করে দেওয়ার ভাবনা এই প্রথম। তৃণমূলের ‘জয়হিন্দ বাহিনী’র সভাপতি তথা মুখ্যমন্ত্রীর ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত এই পরিকল্পনায় আপাতত মজেছে দক্ষিণ কলকাতা। ভবানীপুর বিধানসভা এলাকার আটটি ওয়ার্ডেই বসানো হচ্ছে এই অভিনব বুথ। শুক্রবার রাতে মুখ্যমন্ত্রীর নিজের পাড়া অর্থাৎ ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের মুক্তদল মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম বুথটি বসানো হয়েছে। চতুর্ভুজ আকৃতির এই বুথের ডানদিকে হাতজোড় করা স্মিতহাস্য দিদির ছবি, আর ঠিক পাশেই ভোটারদের দাঁড়ানোর জন্য রাখা হয়েছে অঢেল জায়গা। উপরে জ্বলজ্বল করছে জোড়াফুল প্রতীক। বুথের উপরের অংশে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা হয়েছে, ‘উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে ভবানীপুর বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আপনার মূল্যবান ভোট দিন।’ এবারের লড়াই তৃণমূলের কাছে পরম সম্মানের। গত পাঁচ বছর ধরে বিধানসভার অন্দরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর যে তীব্র দ্বৈরথ চলেছে, তার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে এই ভবানীপুরের বুথেই। পাঁচ বছর আগে এই লড়াইয়ের ভরকেন্দ্র ছিল নন্দীগ্রাম, তবে এবার ঘরের মাঠে মুখ্যমন্ত্রীকে বাড়তি মাইলেজ দিতে মরিয়া ফিরহাদ হাকিম ও সুব্রত বক্সীর মতো প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতারা। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর কারণে ভবানীপুর থেকে প্রায় ৪৭ হাজার নাম বাদ যাওয়ায় এবং আরও ১৪ হাজার ভোটারের ভাগ্য ঝুলে থাকায় কিছুটা সতর্ক কালীঘাট। খোদ মমতাও হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, ‘এক ভোটে হলেও আমি ভবানীপুর থেকে জিতব।’ সেই লক্ষ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কর্মী সম্মেলনে ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ের লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন। তৃণমূলের এই নতুন কৌশলে ইতিমধ্যেই এলাকায় ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে। ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তথা মুখ্যমন্ত্রীর ভ্রাতৃবধূ কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায় এই উদ্যোগে উচ্ছ্বসিত। তিনি জানিয়েছেন, ‘শুক্রবার রাতে ফোটো কর্নারটি বসানো হয়েছে। বসানো মাত্রই আমরা অভাবনীয় সাড়া পেয়েছি। এলাকার মানুষ যেমন ওই ফোটো কর্নারে গিয়ে ছবি তুলছেন, তেমনই বহু পথচলতি মানুষও এই প্রচারের অংশ হচ্ছেন। অনেকে ফোটো কর্নার দেখে গাড়ি থেকে নেমেও ছবি তুলছেন। আশা করছি, ভবানীপুর জুড়ে আমাদের এই প্রচার কৌশল কার্যকরী হবে।’ নিচতলার কর্মীদের দাবি, এই সেলফি উন্মাদনা ভোটের বাক্সেও নিশ্চিত প্রতিফলন ঘটাবে। বুথের নিচে আমজনতার উদ্দেশ্যে লেখা থাকছে স্পষ্ট বার্তা, ‘উন্নয়নের পথে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে সবাই মিলে ছবি তুলুন, বাংলার কথা বলুন।’ সশরীরে প্রার্থীকে না পেলেও তাঁর ছবির সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হওয়ার এই সুযোগ সাধারণ ভোটারের আবেগকে সরাসরি ছুঁতে চাইছে তৃণমূল। মূলত তরুণ প্রজন্ম ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের কাছে টানতেই এই জাঁকজমকপূর্ণ ডিজিটাল কৌশল সাজানো হয়েছে। বিরোধী শিবিরের মোকাবিলায় এক চুল জমিও ছাড়তে রাজি নয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেনানিরা।