নয়া জামানা ডেস্ক : ‘ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম উঠেছে, কৃতিত্ব আমাদের, আমরা লড়াই করেছি’! বীরভূমের দুবরাজপুরে নির্বাচনী জনসভা থেকে এভাবেই হুঙ্কার ছাড়লেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার পাণ্ডবেশ্বরের পর দুবরাজপুরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিজেপি-কে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে এনআরসি এবং সেনসাসের চক্রান্ত করছে কেন্দ্র। তাঁর অভিযোগ, ‘বিজেপি এখন উকুন বাছাই করছে ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিন দিয়ে।’ ভোটার তালিকায় নাম থাকা নিয়ে দুশ্চিন্তার বাতাবরণে আশ্বাস দিয়ে মমতা বলেন, তৃণমূল পাশে থাকলে কাউকে কোথাও যেতে হবে না। তাঁর দাবি, এই লড়াইয়ের ফলেই সাধারণ মানুষ তালিকায় নিজেদের জায়গা ধরে রাখতে পেরেছেন।
বিজেপি-র বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ওয়াশিং মেশিনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে বিজেপি।’ এনআরসি প্রসঙ্গে ভোটারদের সতর্ক করে তাঁর কড়া মন্তব্য, ‘এ দেশ আপনার জন্মভূমি কি না, আপনার বাবা-মা এখানে জন্মেছেন কি না! এ কী কথা। এর পর করবে এনআরসি। তার পরে সেনসাসের নামে, যাদের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে, তার অর্ধেক কাটবে— এটাই পরিকল্পনা।’ নিজের অস্তিত্ব, সম্মান এবং আশ্রয় বাঁচাতে এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। লড়াইয়ের বার্তা দিয়ে মমতা জানান, ‘আমরা এসআইআর মানিনি। রাস্তায় পাঁচ দিন পড়েছিলাম। কোর্টে গেছিলাম।’ তিনি সাফ জানান, ‘বিজেপি, ভ্যানিশ কুমারকে দায়িত্ব নিতে হবে’ যদি ভোট চলাকালীন কোনও হিংসা ঘটে। তবে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রশাসন থাকায় তাঁর হাতে ক্ষমতা নেই বলেও স্মরণ করিয়ে দেন নেত্রী।
শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়ে রামনবমীর প্রাক্কালে তৃণমূল নেত্রী বলেন, ‘শান্তি বজায় রাখবেন রামনবমীতে। আগামী কাল কোনও কর্মসূচি রাখিনি। আমাদের অনেকে মিছিল, মিটিং করেন। অন্যরাও করে। নবরাত্রি চলছে। কাল অন্য কাজ করব।’ তবে ভোটারদের সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। মমতার নির্দেশ, ‘ভোটটা দেবেন তো! যদি ভয় দেখায়, ভয় পাবেন? পাবেন না। এই লোকটা আইন মানে না। বেলাইনের পথিক। সকলে আইনজীবী নিয়ে যাবেন সঙ্গে করে, যাতে কোনও বজ্জাতি করতে না পারে।’ বিজেপি-কে আক্রমণ করে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ‘ওরা যত করবে চক্রান্ত, তত হবে ব্যর্থ। যাঁরা লাইনে, তাঁদের বেলাইন করব।’ এমনকি ভোট পরবর্তী পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিয়ে তাঁর কটাক্ষ, ‘হাঁদা-ভোদা দুই ভাই, চক্রান্ত করে তাই। যতই করো হামলা, তৃণমূল জিতবে বাংলা। নির্বাচনের পরে পিঠে পোস্টার লাগিয়ে বলতে হবে আমি বিজেপি করি না।’
লকডাউন এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়েও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ভোট আটকাতে ফের লকডাউনের পরিকল্পনা চলছে। মমতা বলেন, ‘কেউ কেউ বলছিলেন, আবার নাকি লকডাউনের কথা ভাবছে, যাতে লোকে বেরোতে না পারে। ২০২১ সালে তখন যদি ভোট করতে পারি, এখন যতই লকডাউন করো, মানুষের মুখে হাতে তালা-চাবি লাগাতে পারবে না। ওটা মানুষের নিজস্ব অধিকার।’ রান্নার গ্যাসের দাম নিয়ে আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্যাস বেলুন এখন গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। দু’দিন পরে গ্যাস পাবেন কি না জানি না! আবার গরুর গাড়ি। আবার উনুন! গ্যাসের দাম বেড়েছে। গ্যাস বেলুনের দয়ায় আজ গ্যাসের দাম ১১০০ টাকা। রেলের টিকিট যেমন রোজ বাড়ায়। বড় গ্যাস ২,১০০। আজ বলছে ২৫ দিন (সিলিন্ডার বুকিংয়ের সময়সীমা)। কী দিয়ে রান্না করবে? আমার মাথা খাবে, না কি বিজেপির মাথা।’ কেন্দ্রকে ‘ডাকাতের দল’ বলে তোপ দেগে তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি রেল এবং এলআইসি বিক্রি করে দিচ্ছে।
বীরভূমের জেলা রাজনীতিতে জেলবন্দি অনুব্রত মণ্ডলের অভাব যে তিনি অনুভব করছেন, তাও স্পষ্ট করে দেন মমতা। ‘কেষ্ট অনেক সাহায্য করেছে। বীরভূম জেলা ওর নখদর্পণে’— এ কথা বলে তিনি বীরভূমের উন্নয়ন খতিয়ান তুলে ধরেন। দেউচা-পচামি কয়লাখনি প্রকল্পে এক লক্ষ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই দেউচা-পচামি হলে বিদ্যুতের চাহিদা মিটবে। অভাব হবে না আগামী ১০০ বছর।’ একইসঙ্গে জেলাবাসীর উদ্দেশে তাঁর আবেগঘন মন্তব্য, ‘পিতৃভূমি, মাতৃভূমি বীরভূমে। বাবা-জেঠুরা দেবোত্তর সম্পত্তি পান। বাবা নেননি। জ্যাঠামশাইদের ছেড়ে দেন। নির্বাচনের পরে ঘুরে আসব।’
সরকারি প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন কি না, সভায় তারও তদারকি করেন মুখ্যমন্ত্রী। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প আজীবন চলবে বলে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘কারও মিথ্যায় ভুলবেন না, আমরা লড়াই করেছি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার চান! মনে রাখুন সারাজীবন চলবে। বিজেপি বিহারে ভোটের আগে ৮ হাজার দিল। পরে বুলডোজ়ার চলল। আমরা আগে দিয়েছি, তার পরে কথা বলব।’ আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের মাধ্যমে ৯ কোটি মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। সবশেষে বীরভূমের প্রার্থীদের হয়ে ভোট চেয়ে মমতার শেষ কথা, ‘তৃণমূল ছাড়া কোনও দল নেই, যারা বাংলায় ক্ষমতায় আসতে পারে। যতই চক্রান্ত করো, সব ব্যর্থ হবে।’