নয়া জামানা ডেস্ক : একুশের বিধানসভা নির্বাচনে নিজের ঘরের লোকেদের বিরুদ্ধেই উঠেছিল অন্তর্ঘাতের গুরুতর অভিযোগ। পরাজয়ের সেই পুরনো কাঁটা উপড়ে ফেলতেই এবার কোমর বেঁধে ময়দানে নামলেন তৃণমূলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার নন্দীগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘শুনেছি আগের বার আমাদের লোকেরাই হারিয়েছিল! এ বার আমি নিজে নজর রাখছি’। গতবারের হারকে কার্যত ‘কলঙ্ক’ হিসেবে দেগে দিয়ে এবার সেই মাটি ‘পবিত্র’ করার ডাক দিয়েছেন তিনি। দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রাক্তন বিজেপি নেতা পবিত্র করের নাম ঘোষণা করে অভিষেক বুঝিয়ে দিয়েছেন, এবার লড়াই ‘ভূমিপুত্র’ বনাম ‘ভূমিপুত্রে’র।
বুধবার বিকেলে পশ্চিম মেদিনীপুরে জোড়া সভা সেরে নন্দীগ্রামে পৌঁছন অভিষেক। সেখানে এক বিশেষ কর্মিসভায় যোগ দেন তিনি। ওই বৈঠকে উপস্থিত কর্মীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সূত্রের খবর, সভায় অভিষেক নাকি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে তাঁকে অনেকেই জানিয়েছেন গতবার দলের একাংশই মমতাকে হারিয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। এবার যাতে সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য স্থানীয় নেতাদের সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। অভিষেকের কথায়, ‘এই লড়াই নন্দীগ্রামকে কলঙ্কমুক্ত করার লড়াই। এই লড়াই নন্দীগ্রামকে ‘অপবিত্র’ থেকে ‘পবিত্র’ করার লড়াই’।
দলের অন্দরে ‘সকালে তৃণমূল, রাতে শুভেন্দু’ তকমা ঘোচাতে অভিষেক এদিন আবেগ এবং হুঁশিয়ারি— দুই অস্ত্রই ব্যবহার করেন। তিনি কর্মীদের প্রশ্ন করেন, ভবিষ্যতে তাঁদের ছেলেমেয়েরা যদি রাজনীতিতে আসে এবং শোনে যে তাঁদের বাবা-মায়ের নাম ‘গদ্দার’-দের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তবে কেমন লাগবে? এই আবেগঘন বার্তার পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট জানান, আগামী ২৫ দিন তাঁদের দলের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করতে হবে। বিনিময়ে আগামী পাঁচ বছর নন্দীগ্রামের যা যা করার, তার দায়িত্ব তিনি নিজে নেবেন।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে নাম না করে কড়া আক্রমণ শানিয়ে অভিষেক বলেন, যাঁকে এখানকার মানুষ ভোট দিয়ে জিতিয়েছিল, তিনি আজ দিল্লির বাবুদের কাছে ছুটে গিয়ে বাংলার উন্নয়নের টাকা আটকে দিয়েছেন। সাহস থাকলে বিধায়ক স্থানীয় মানুষের জন্য ক’টা বাড়ি এনেছেন তার রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করুন। সূত্রের খবর, কর্মীদের মনোবল বাড়াতে অভিষেক আশ্বাস দিয়েছেন যে যদি সিবিআই নোটিস পাঠায়, তবে তার আইনত মোকাবিলার দায়িত্ব তিনি নিজে নেবেন। লড়াইয়ের সুর কয়েক পর্দা চড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন, যারা বেশি লাফালাফি করবে তাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে, ৪ মে ফলঘোষণার পরে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে ডিজে-ও বাজবে।
নন্দীগ্রামের পাশাপাশি এদিন কেশিয়াড়িতেও প্রচার সারেন অভিষেক। সেখানে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগে সরব হয়ে তিনি ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান এবং আবাস যোজনার সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, কেন্দ্র টাকা আটকে দিলেও মা-মাটি-মানুষের সরকার ১৫০০ কোটি টাকা খরচ করে সেই কাজ শুরু করেছে। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে ইভিএম-এর লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষকে এই বঞ্চনা এবং শোষণের যোগ্য জবাব দিতে হবে। এই নির্বাচন ‘প্রতিবাদের, প্রতিশোধের এবং প্রতিরোধের ভোট’ হবে।
গদ্দার-তকমা থেকে বাঁচতে এবং নন্দীগ্রামের ‘ভূমিপুত্র’ পবিত্র করের জয় নিশ্চিত করতে অভিষেক এখন থেকেই মাইক্রো-ম্যানেজমেন্টে জোর দিচ্ছেন। গতবার যে সব বুথে তৃণমূল পিছিয়ে ছিল, এবার সেখানে ভোট বাড়ানোর জন্য কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নন্দীগ্রামের মাটিকে আবারও তৃণমূলের দুর্গে পরিণত করাই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য। আইপ্যাকের রণকৌশলে বিজেপির ব্লক সভাপতিকে নিজেদের দিকে টেনে এনে শুভেন্দুর গড়ে ফাটল ধরাতে চাইছে শাসকদল। হলদি নদীর তীরের এই রাজনৈতিক সমীকরণ এখন কোন দিকে ঘোরে, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।