নয়া জামানা ডেস্ক : ‘আমি বেঁচে থাকতে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেব না। আমার পরের প্রজন্মও করতে দেবে না।’ উত্তরবঙ্গের মাটি থেকে এভাবেই বিজেপি সরকারকে এনআরসি ইস্যুতে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার ময়নাগুড়ি, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি ও নকশালবাড়ির নির্বাচনী জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে তীব্র আক্রমণ করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর সাফ অভিযোগ, বিজেপি ও কমিশন যোগসাজশ করে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করছে। বিশেষ করে মধ্যরাতে কমিশনের ওয়েবসাইটে ভোটারদের নাম ‘বিচারাধীন’ হয়ে যাওয়াকে ‘টেকনিক্যালি বজ্জাতি’ বলে তোপ দাগেন তিনি। নিজের নামও সন্দেহের তালিকায় দেখে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মমতা বলেন, ‘হঠাৎ করে কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে সব নাম উড়ে গেল। এখন বলছে হ্যাকিং হয়েছে। হ্যাকিং করেছ না বজ্জাতি করছ, মানুষকে জানাও।’ তিনি বলেন, ‘বিজেপি-কমিশন মিলে আমার সব কেড়ে নিয়েছে, তবে আমার কাছে মানুষ আছে। বিজেপি পার্টি ভ্যানিশ পার্টি।’ যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁদের বিনামূল্যে আইনি লড়াইয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন এদিন তিনি।
ভোটের মুখে উত্তরবঙ্গে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এসআইআর এবং এনআরসি। তিনি বলেন, ‘এসআইআর-এর জন্য ৮৫ বছরের মায়েদের লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। এখন বিজেপি জিজ্ঞাসা করছে আপনি এদেশের নাগরিক কিনা? কোথায় ছিলে যখন স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছিল? এখনকার বিজেপি নেতারা তো তখন জন্মায়নি। আজকে প্রমাণ করতে হবে আমরা এ দেশের নাগরিক কিনা?’ এনআরসি ও ডিটেনশন ক্যাম্পের জুজু দেখিয়ে তৃণমূল নেত্রী সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে দেন। তাঁর দাবি, এনআরসি রুখতে তাঁর পরের প্রজন্মও লড়াই চালিয়ে যাবে। ভোটার তালিকা বিভ্রাট নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এখনও সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশ করা হল না। তাঁর আশঙ্কা, প্রায় আট লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিজেপির বিরুদ্ধে বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্রের মারাত্মক অভিযোগও তোলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘বাংলা দখল করতে পারছে না বলে এখন বিহারের চারটি জেলা ও উত্তরবঙ্গকে নিয়ে আলাদা রাজ্য করতে চাইছে বিজেপি। প্রাণ থাকতে ভাগাভাগি হতে দেব না। একটা কাজ করতে পারে না। গলায় দড়ি দিয়ে ডুবে মরা উচিত। বাংলার টাকা দেয় না।’ চা-বাগান থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের সার্বিক উন্নয়নের খতিয়ান দিয়ে তিনি দাবি করেন, বিজেপি কেবল বিভাজনের রাজনীতি জানে। শিলিগুড়িতে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যান্সার হাসপাতাল এবং ১৭ একর জমিতে মহাকাল মন্দির তৈরির কথা উল্লেখ করে তিনি নিজের সরকারের কাজের প্রমাণ দেন। বিজেপিকে ‘গ্যাস বেলুন’ আখ্যা দিয়ে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও সরব হন তিনি। তাঁর কটাক্ষ, ‘গ্যাস বেলুনের গ্যাস বেরিয়ে গিয়েছে। মানুষ খেতে পাবে না। আবার পুরনো দিনে ফিরে যেতে হবে। এরা বেশি দিন থাকলে দেশটাকেই বেচে দেবে।’
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের বদলি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমি নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এই প্রথম না জানিয়ে সব অফিসারকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। খাদ্য দেবে কে? ঝড় হলে সুরক্ষা দেবে কে?’ এমনকি কেন্দ্রীয় বাহিনীর একাংশের বিরুদ্ধে বিজেপির হয়ে কাজ করার অভিযোগ এনেছেন তিনি। তাঁর দাবি, কোথাও কোথাও কেন্দ্রীয় বাহিনী বিজেপির পতাকা নিয়ে ঘুরছে। এই পরিস্থিতিতে মা-বোনেদের বুথ পাহারার ডাক দিয়েছেন মমতা। তিনি এও বলেন ‘আমি কেন্দ্রীয় বাহিনীদের সম্মান করি’ । তিনি বলেন, ‘এসআইআর-এর বদলা একটা করে ভোট। মা-বোনেরা ভোটের দিন সকাল থেকে বুথ পাহারা দিন। যাতে দিল্লির লোকজন এসে ছাপ্পা না দিতে পারে। ভয় দেখালে ঘরে যা আছে তা নিয়ে বেরোবেন। আপনারা তো রান্নাবান্না করেন, আমাকে আর বেশি বলতে হবে না।’
বিজেপির নেতাদের হুঁশিয়ারিকেও এদিন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন মমতা। ময়নাগুড়ির প্রার্থীকে গাছে বেঁধে পেটানোর হুমকির জবাবে তিনি বলেন, ‘শুনলাম আমার প্রার্থীকে বিজেপির এক মন্ত্রী বলে গিয়েছে গাছে বেঁধে পেটাবে। আমি বলি গাছটা আমাদের, সবুজটাও আমাদের, জঙ্গলটাও আমাদের। বলি গাছটা বেঁধে পেটানোর জন্য নয়।’ তিনি বলেন, বিজেপি হিংসুটে দল, তারা সাধারণ মানুষের নাগরিকত্ব ও অধিকার কেড়ে নিতে চায়। এসআইআর-এর জেরে রাজবংশী ও আদিবাসীদের হয়রানির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আদিবাসী, রাজবংশীদের বেছে বেছে নোটিস দিয়েছে। এর পরে এনআরসি করবে। ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে। আমি থাকতে তা কখনও হবে না।’
এদিন রামনবমী ও বাসন্তী পুজো নিয়ে বিজেপির রাজনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাম কারও কেনা নয়। সব ধর্মকে নিয়ে চলাই বাংলার সংস্কৃতি। এই সংহতি বজায় রাখতেই বিজেপিকে বিদায় দেওয়ার ডাক দেন তিনি। তাঁর চূড়ান্ত হুঙ্কার, ‘মনে রাখবেন আহত বাঘ আরও ভয়ঙ্কর। এবার বাংলা দখল করব, তারপর দিল্লি দখল করব। দিল্লি এখন দিল্লিতে ক্ষমতায় আছে, পাল্টে যাবে।’