নয়া জামানা ডেস্ক : সরকারের কি কোনও মৌলিক অধিকার থাকতে পারে? আইপ্যাক মামলায় বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এই অমোঘ সাংবিধানিক প্রশ্নটিই ছুড়ে দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র এবং বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়ার বেঞ্চে রাজ্যের সওয়াল, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) কোনও রক্তমাংসের ব্যক্তি নয়, বরং ভারত সরকারের একটি বিভাগ মাত্র। ফলে সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের দোহাই দিয়ে ইডি কোনও মামলা করতে পারে না। বুধবারের শুনানিতে ইডির মামলার গ্রহণযোগ্যতা ও এক্তিয়ার নিয়েই কার্যত এক নজিরবিহীন আইনি যুদ্ধ শুরু হল শীর্ষ আদালতে।
গত ৮ জানুয়ারি কয়লা পাচার মামলার সূত্রে আইপ্যাকের সল্টলেক দপ্তর এবং কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে হানা দিয়েছিল ইডি। অভিযোগ, সেই তল্লাশি চলাকালীনই সেখানে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বেশ কিছু নথিপত্র ও ল্যাপটপ সরিয়ে নিয়ে আসেন। কেন্দ্রীয় সংস্থার কাজে এই ‘হস্তক্ষেপে’র প্রতিবাদেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল ইডি। বুধবার সেই মামলার শুনানিতেই রাজ্যের তরফে বর্ষীয়ান আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান এবং কপিল সিব্বল পাল্টা সওয়াল শুরু করেন। তাঁদের মূল যুক্তি ছিল, ইডি একটি সরকারি তদন্তকারী সংস্থা হতে পারে, কিন্তু সংবিধান তাকে কোনও নাগরিকের মতো অধিকার দেয়নি।
রাজ্যের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান সাফ জানান, সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল নাগরিক বা ব্যক্তিরাই মৌলিক অধিকার রক্ষার আর্জি জানাতে পারেন। ইডি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি অংশ বা ডিরেক্টরেট মাত্র। তাই তাদের ব্যক্তিগত কোনও ‘মৌলিক অধিকার’ থাকতে পারে না। দিওয়ানের কথায়, ‘সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করতে গেলে মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন থাকতে হবে। কিন্তু তা শুধুমাত্র ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু ব্যক্তির বাইরে কারও মামলা করার কোনও অধিকারই নেই।’ তিনি আরও বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, একটি সরকারি সংস্থা হয়ে ইডি কী ভাবে নিজেরই সরকার অর্থাৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে মামলা লড়ছে? কারণ এই মামলায় ইডি কেন্দ্রকেও পক্ষ করেছে। দিওয়ান বলেন, ‘ইডি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি অংশ। এখানে মামলা করেছেন ইডির ডিরেক্টরেট। ফলে আইনের মধ্যে থেকেই কোনও ডিরেক্টরেটকে মামলা করতে হবে।’
রাজ্যের দাবি, যদি কোনও সরকারি দপ্তরকে সরাসরি মামলা করার ঢালাও অনুমতি দেওয়া হয়, তবে সংবিধানের ১৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত রাজ্য ও কেন্দ্রের বিবাদ মেটানোর যে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। ইডি বড়জোর ১৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে মামলা করতে পারত কিংবা সংশ্লিষ্ট ঘটনায় এফআইআর করতে পারত। রাজ্যের বক্তব্য অনুযায়ী, পিএমএলএ বা আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইনে ইডিকে তদন্তের নির্দিষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হলেও, স্বাধীন ভাবে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করার আইনি অধিকার দেওয়া হয়নি। সিবিআই বা সিআইডির উদাহরণ টেনে দিওয়ান বলেন, এদের কারও মামলা করার ক্ষমতা নেই। যদি সব সংস্থা পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা করতে শুরু করে, তবে প্রশাসনিক কাঠামো ও আইনি ভারসাম্য নষ্ট হবে।
শুনানির এক পর্যায়ে বিচারপতি মিশ্র প্রশ্ন করেন, ‘মামলা করার অধিকার কার রয়েছে, তা নিয়ে সওয়াল করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রী যদি তদন্তে ঢুকে পড়েন, তা হলে ইডি কী করবে? এর পরে তো অন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও ঢুকে পড়লে কিছু করা যাবে না। এটা মোটেও সুখকর পরিস্থিতি নয়। একেবারেই অনভিপ্রেত ঘটনা।’ বিচারপতির পাল্টা প্রশ্ন ছিল, যদি সংবিধানের ২২৬ বা ৩২ অনুচ্ছেদ, কোনওটির মাধ্যমেই এই বিষয়ের মীমাংসা না হয়, তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার বিচার কে করবে? যদি ভবিষ্যতে অন্য কোনও মুখ্যমন্ত্রীও এ ভাবে অন্য কোনও দপ্তরে প্রবেশ করেন, তখন তার বিচার কী ভাবে হবে?
মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে আইনজীবী কপিল সিব্বল ইডির মৌলিক অধিকারের দাবিকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেন। ইডি এই মামলায় সিবিআই-কেও পক্ষভুক্ত করেছে যাতে আদালত সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। সিব্বলের সরাসরি অভিযোগ, ‘ইডি আসলে চাইছে আদালত যেন সিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। কিন্তু ইডি নিজে থেকে এমন দাবি করতে পারে না।’ ইডি অফিসাররা হুমকির মুখে পড়েছেন বলে আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল। তার প্রেক্ষিতে সিব্বল প্রশ্ন তোলেন, ‘ধরুন, তাদের সত্যিই হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা হলেও এখানে কোন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে?’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অর্থ তছরুপ প্রতিরোধ আইনের বাইরে ইডির কোনও ক্ষমতা নেই। তবে তারা কোন মৌলিক অধিকারের দাবি করছে?’
এদিন রাজ্যের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীও মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘ শুনানি চান। তিনি সাফ বলেন, রাজ্য এই মামলার মেরিট বা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলাদা করে সওয়াল করতে আগ্রহী। অন্যদিকে কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল পালটা দাবি করেন, মামলা পিছনোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে। তিনি বিরক্তির সুরে বলেন, দুই সপ্তাহ আগেই হলফনামা দেওয়া হয়েছে, এখন মুখ্যমন্ত্রী কেন আরও সময় চাইছেন? ৮ জানুয়ারির সেই নাটকীয় ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন, যা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। আর এখন সেই মামলার শুনানিতে বারবার দেরি করা হচ্ছে।
আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আপাতত রেকর্ডে যা তথ্য রয়েছে তার ভিত্তিতেই শুনানি এগোবে। রাজ্য ইডির পালটা হলফনামা জমা দিতে চেয়েও কেন গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তা নিয়ে আদালত প্রশ্ন করে। তবে আদালত জানায় প্রয়োজনে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে। আগামী সপ্তাহে ফের এই হাই-প্রোফাইল মামলার শুনানি হবে সুপ্রিম কোর্টে। কেন্দ্র বনাম রাজ্যের এই লড়াই এখন স্রেফ নথিপত্র উদ্ধারের গণ্ডি পেরিয়ে সংবিধানের ১৩১ বনাম ৩২ অনুচ্ছেদের মৌলিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।