নয়া জামানা ডেস্ক : রাতারাতি রাজ্যের প্রশাসনিক ও পুলিশের শীর্ষ স্তরে রদবদল নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে কার্যত রনংদেহি মেজাজে ধরা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার গভীর রাতে মুখ্যসচিব পদ থেকে নন্দিনী চক্রবর্তী এবং স্বরাষ্ট্রসচিব পদ থেকে জগদীশ প্রসাদ মীনাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘মধ্যরাতের গুপ্ত তাণ্ডব’ বলে বর্ণনা করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সোমবার কলেজ স্ট্রিট থেকে ডোরিনা ক্রসিং পর্যন্ত মহামিছিল শেষে ধর্মতলার মঞ্চ থেকে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, প্রশাসনিক রদবদল ঘটিয়ে তৃণমূলকে রোখা যাবে না। বরং আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের আসন সংখ্যা আরও বাড়বে। আত্মবিশ্বাসের সুরে তাঁর চ্যালেঞ্জ, ‘আবার দেখা হবে। নবান্নে দেখা হবে। দেখব, কত হামলা, কত বদলা নিতে পারো।’ রবিবার রাত একটা নাগাদ প্রশাসনিক রদবদলের খবর পান মুখ্যমন্ত্রী। এই অস্বাভাবিক সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ আখ্যা দিয়ে মমতা বলেন, ‘গত রাতে কী করলেন? রাত্রি একটায় আমি মেসেজ পেলাম। মধ্যরাতে কখনও শুনেছেন? একটা দল কাউকে কাজে লাগিয়ে ছুপারুস্তমের মতো বিহাইন্ড দ্য সিন মধ্যরাতে গুপ্ত তাণ্ডব করেছে।’ নিয়ম অনুযায়ী রাজ্যের থেকে নামের তালিকা না চেয়ে কমিশনের এই ‘সুয়োমোটো’ সিদ্ধান্তকে মগের মুলুক এবং দিল্লির জমিদারি বলে তোপ দাগেন তিনি। তাঁর সরাসরি অভিযোগ, বিজেপিকে সন্তুষ্ট করতেই এই ‘জমিদার ও জোতদারদের’ মতো আচরণ। প্রসঙ্গত রাজ্যের মুখ্য সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিব সহ প্রশাসনের উচ্চ স্তরে এই রদবদল নিয়ে রাজ্যসভায় সড়ক হয় তৃণমূল কংগ্রেস । এদিন রাজ্যসভায় ওয়াক আউট করে তৃণমূল সাংসদরা । নন্দিনী চক্রবর্তীকে সরানোর প্রসঙ্গে সরাসরি নারীবিদ্বেষ এবং বাঙালি-বিদ্বেষের অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘চিফ সেক্রেটারি একজন বাঙালি ও মহিলা। ওঁরা অ্যান্টি উইমেন… আপনারা নন্দিনী চক্রবর্তীকে রাত্রি সাড়ে বারোটার পরে তাণ্ডব করে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন। একবার রাজ্যকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করলেন না, বিজেপির দালালি করতে গিয়ে। ধিক আপনাদের।’ শুধু বাঙালি নয়, পীযূষ পান্ডে, সুপ্রতিম সরকার বা বিনীত গোয়েলের মতো দক্ষ অবাঙালি অফিসারদেরও সরিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হচ্ছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সাফ কথা, ‘যাঁকেই পাঠান, তাঁরা আমাদের হয়ে কাজ করবেন। মানুষের হয়ে কাজ করবেন।’ এ দিন দেশে রান্নার গ্যাসের ‘কৃত্রিম সঙ্কট’ তৈরির অভিযোগে প্রতিবাদে পথে নামেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের মুখে চক্রান্ত করে গ্যাসের সার্ভার বন্ধ রাখা হয়েছে। মোদির ব্রিগেড সমাবেশকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘গ্যাস দিন মানুষকে, গ্যাস বেলুন নয়। বিজেপি দল ব্রিগেড ভরানোর জন্য ক্যাশ দিয়ে লাভ নেই। ওই ক্যাশটা গ্যাসে দিন। গ্যাস দেওয়ার ক্ষমতা নেই ক্যাশ দিচ্ছে।’ রাজ্য বিজেপি নেতাদের কালীঘাট আক্রমণের হুমকির পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনি বলেন, ‘বুকের পাটা থাকলে হামলা করে দেখান, লড়াইয়ে নামব। সব ক’টাকে লড়ে নেব। আমরা কেউ ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না। আমরা ঘাসকে জন্ম দিই।’ এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ‘চুন চুন কে মারেঙ্গে’ মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে একে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অশোভন বলে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশাসনের সব কিছু বদলে দিলেও বাংলার সরকার বদলাবে না বলে এ দিন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী দেখায় তৃণমূল সুপ্রিমোকে। জনসভা থেকে তিনি হুঙ্কার দেন, ‘আমরা মাছের কাঁটা বাছি, আপনারা রাজনীতির উকুন বাছেন। সব চেঞ্জ করে দিন, তার পরেও বাংলার সরকার বদলাবে না। লিখে নিন।’ বিজেপিকে ‘ছক্কা মেরে অক্কা’ করে দেওয়ার ডাক দিয়ে তিনি বলেন, তৃণমূল মানুষের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। বিরোধীদের ‘ডাকাতদের সর্দার’ বলে আক্রমণ করে মমতা মনে করিয়ে দেন, পুলিশের ওপর দাদাগিরি করে লাভ নেই। বিজেপি নেতাদের বাংলা ভাষা শেখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘রানি রাসমণিকে বলছেন রসোমণি! মাতঙ্গিনীকে কী যেন বলেছিলেন, আমি উচ্চারণ করতে পারছি না।’ বিজেপিকে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘তোমার পরিবর্তনের সঙ্কল্প গল্প হয়ে থেকে যাবে। তোমার পরিবর্তন হবে না। তৃণমূলের প্রত্যাবর্তন হবে।’ কোনো প্ররোচনায় পা না দেওয়ার আর্জি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে বলেছি, বদলা নয় বদল চাই। এ বার বলছি, বিজেপি হটাও।’ সব শেষে তৃণমূল কর্মীদের চাঙ্গা করে তাঁর সংক্ষিপ্ত বার্তা, ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা।’
বিভ্রাট রুখতে ৮৫০৫ অফিসার নবান্নের, সুপ্রিম শুনানিতে আজ ফের কোর্টে মমতা !