এম ওয়াহেদুর রহমান
শিক্ষক
‘বিশ্বে যা – কিছু সৃষ্টি চির – কল্যাণকর,অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ নারী – পুরুষ সম অংশগ্রহণ ব্যতীত সমাজের আসল উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীদের সম্মান, ক্ষমতায়ন ও সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করলেই হয়তো আমরা সমতাভিত্তিক তথা প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারবো। নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও তাদের সামাজিক , সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাফল্য স্মরণ করার উদ্দেশ্যে ১৯১১ সাল থেকে প্রতিবছর ৮ মার্চ তারিখে বিশ্বব্যাপী মহাসমারোহে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আন্তর্জাতিক নারী দিবস টি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোকবর্তিকা,যা নারীদের সমতা ত্বরান্বিত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তবে বিশ্বের এক এক প্রান্তে নারী দিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য এক এক প্রকার হয়। কোথাও নারীদের সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনের মুখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও নারীদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাটি বেশি গুরুত্ব পায়।
বর্তমান যুগ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নারী দিবস শুধুমাত্র উদযাপনের একটি দিন নয়, বরং লিঙ্গ সমতা, নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সর্বোপরি শোষণের বিরুদ্ধে সংহতি প্রকাশের অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি দিন। বিশ্বজুড়ে নারীরা বর্তমান সময়েও সমান মজুরি, কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছানোর লড়াই করছেন। এই আন্তর্জাতিক নারী দিবস টি নারীদের অধিকার আদায়ের দাবির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই বর্তমান সময় পর্যন্ত নারীরা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। এখনও তাঁরা হয়তো ঘরোয়া ও কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তবে কি আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতা ও বাক – সর্বস্ব ! এই দিনে মোমবাতি প্রজ্বলন, সমাবেশ, শোভাযাত্রা, সেমিনার , আলোচনা, পুরস্কার বিতরণ, ব্যানার ফেস্টুন হাতে নিয়ে মিছিল প্রভৃতি কি লোক দেখানো ” আদিখ্যেতা” ! এ কথা সমুত্থিত সত্য যে, একটি বিশেষ দিনে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন কিংবা তার বিরুদ্ধে সংগঠিত অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেই কি নারী সমাজ মুক্তি পাবে ?
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের প্রেক্ষাপটে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম । ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলেছিল সরকারি লেঠেল বাহিনীর দমন – পীড়ন।১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ক্লারা ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এই সম্মেলনে ক্লারা প্রতিবছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়েই পালিত হচ্ছে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
নারীদের প্রতি বৈষম্য কেবলমাত্র একক কোনও দেশের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বিশ্বব্যাপী বহু শতাব্দীর সামাজিক সমস্যা। অতীতে নারীদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। তাঁরা ভোট দিতে পারতেন না , সম্পত্তির মালিক হতে পারতেন না। এমনকি স্বাধীনভাবে নিজের জীবন পরিচালনার অধিকারও তাঁদের ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নারীরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হয়েছেন। নারীরা শিক্ষা , ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার সহ নানান ক্ষেত্রে ক্রমশই অগ্ৰসর হয়েছেন । সভ্যতার বিকাশে তাঁরাও সমাহারে অংশগ্রহণ করেছেন। তবুও নারীর প্রতি সহিংসতা রয়ে গেছে। আসলে নারীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সমাজের ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের তাৎপর্য শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি নারীদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের প্রতীক।