টিনা প্রামানিক,নয়া জামানা,মালদা: শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ কয়েকটি অক্ষরের সমষ্টি নয় এটি একটি জাতির মেরুদণ্ড, সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার এবং আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন দেখার শক্তি। একটি ভালো স্কুল শুধু ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় নম্বর পেতে শেখায় না তাদের মানুষ করে তোলে সচেতন, দায়িত্ববান, মানবিক। ঠিক এমনই এক আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে মালদার কালিয়াচকের স্মার্ট স্কুল।
ছোট্ট এক স্বপ্নের বীজ থেকে জন্ম নেওয়া এই প্রতিষ্ঠান আজ হাজারো পরিবারের আশা, বিশ্বাস এবং গর্বের নাম। সাফল্য, শৃঙ্খলা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং সর্বোপরি মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন-সব মিলিয়ে এই স্কুল যেন এক চলমান শিক্ষাবিপ্লব।
সূচনার দিনগুলি:এক স্বপ্নদ্রষ্টার হাত ধরে
প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠানের পেছনে থাকে একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। স্মার্ট স্কুলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। ২০০৪ সালে পরিকল্পনার বীজ রোপণ করেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবী ডা: সেখ সামুয়েল। তাঁর বিশ্বাস ছিল-গ্রামের সন্তানদেরও শহুরে মানের শিক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে।
সেই ভাবনা থেকেই ২০০৫ সালে কালিয়াচকের কারবালা মাঠ সংলগ্ন এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে স্কুলটি।প্রথমদিকে ছিল অল্প কয়েকজন ছাত্রছাত্রী,সীমিত পরিকাঠামো,আর অফুরন্ত স্বপ্ন।
কিন্তু লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট-শিক্ষা হবে আধুনিক, মন হবে মানবিক।
শুরুর সেই ছোট্ট পদক্ষেপই ধীরে ধীরে বড় রূপ নিতে থাকে। ২০০৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি আরও গতিশীল হয়ে ওঠে।পরিকাঠামো বাড়ে, ছাত্রসংখ্যা বাড়ে, আর মানুষের আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

নেতৃত্বে নতুন দিশা
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম।তাঁর নিষ্ঠা, কর্মদক্ষতা এবং ছাত্রবান্ধব মানসিকতা স্কুলটিকে এনে দিয়েছে এক নতুন উচ্চতা।তিনি বিশ্বাস করেন,স্কুল শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, এটা চরিত্র গঠনের কারখানা।
তাঁর তত্ত্বাবধানে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক আন্তরিক দলগত সংস্কৃতি। শিক্ষার্থীদের প্রতিটি সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক ও নৈতিক বিকাশেও সমান জোর দেওয়া হয়।ফলে আজ স্মার্ট স্কুল শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়-এটি এক পরিবার।
ডিজিটাল শিক্ষার আধুনিক পরিকাঠামো
বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্মার্ট স্কুলেও এসেছে ডিজিটাল বিপ্লব।
শ্রেণিকক্ষে এখন রয়েছে স্মার্ট বোর্ড, প্রজেক্টর, অডিও- ভিজ্যুয়াল লার্নিং সিস্টেম। কঠিন বিষয়ও ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে সহজ করে শেখানো হয়। ফলে পড়াশোনা হয়ে উঠেছে আরও আকর্ষণীয় ও আনন্দময়।
বর্তমানে-
* শিক্ষার্থী সংখ্যা: ৬৭৫
* শিক্ষক-শিক্ষিকা: ৩০ জন
* পাঠ্যক্রম: প্লে-নার্সারি থেকে নবম শ্রেণী
* বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংরেজিতে বিশেষ গুরুত্ব
শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত যত্ন নেওয়ার জন্য শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতও যথেষ্ট সুষম। ফলে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী নিজের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বিকশিত করার সুযোগ পায়।
যখন ফলাফলই পরিচয় দেয়
কোনো প্রতিষ্ঠানের আসল পরিচয় তার ফলাফলে।স্মার্ট স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করছে না, রাজ্যস্তরেও নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছে।
স্টেট অলিম্পিয়াডে মালদা জেলার মধ্যে ৭ম ও ৯ম স্থান অর্জন এ এক বড় সাফল্য।এই কৃতিত্ব প্রমাণ করে গ্রামীণ প্রেক্ষাপট থেকেও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় সাফল্য সম্ভব।

কৃতি প্রাক্তনদের অনুপ্রেরণামূলক গল্প
একটি স্কুলের আসল গর্ব তার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। স্মার্ট স্কুলের অ্যালামনিরা আজ সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
উম্মে ফাতেমা-নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে ২০২০ সালে ডিস্ট্রিক্ট ফার্স্ট। বর্তমানে এসএসকেএম-এ ডাক্তারি পড়ছেন।
সোহান সেখ—আরজি কর মেডিকেল কলেজে পাঠরত।
আসিফ মেহবুব—বর্ধমান মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা পরিষেবায় যুক্ত।
তাদের সাফল্য আজ বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রেরণা। তারা দেখিয়ে দিয়েছে স্বপ্ন দেখলে পথ তৈরি হয়।

সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম: বইয়ের বাইরে শেখা
শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। তাই স্মার্ট স্কুলে রয়েছে নানা সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম।
বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, অঙ্কন, নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি সব ক্ষেত্রেই ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করে।বিজ্ঞান মঞ্চ, কুইজ, প্রজেক্ট ও অলিম্পিয়াড তাদের চিন্তাশক্তি বাড়ায়।
বিশেষ দিবস উদ্যাপন-মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, শিক্ষক দিবস এসব অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও সংস্কৃতিবোধ জাগ্রত হয়।এভাবেই শিক্ষা হয়ে ওঠে আনন্দময় ও জীবন্ত।
মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত
এই স্কুলের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক এর মানবিক উদ্যোগ।
বর্তমানে ৫৭ জন অনাথ শিশুকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। শুধু পড়াশোনা নয় তাদের পোশাক, বই, খাবার, যাবতীয় খরচ স্কুল কর্তৃপক্ষ বহন করছে।
এই উদ্যোগ প্রমাণ করে-স্মার্ট স্কুল শুধু মেধা তৈরি করে না হৃদয়ও গড়ে তোলে।
আজকের দিনে এমন নিঃস্বার্থ দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। অনেক পরিবারের কাছে এই স্কুল আশ্রয়স্থল, ভরসার নাম।

আগামীর স্বপ্ন
স্মার্ট স্কুল থেমে থাকতে জানে না। সামনে রয়েছে আরও বড় পরিকল্পনা।
* একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী চালু
* বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ
* নিট কোচিং সেন্টার
* উন্নত ল্যাব ও লাইব্রেরি
* স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম
উদ্দেশ্য একটাই-গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা যেন বড় শহরের সমান সুযোগ পায়।
একটি স্কুল, একটি আন্দোলন
আজ স্মার্ট স্কুল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয় এটি একটি আন্দোলন।অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়ার পথ।
অশিক্ষা থেকে সচেতনতার সেতুবন্ধন।স্বপ্ন থেকে বাস্তবের যাত্রা।ডা: সামুয়েলের বপন করা বীজ আজ রবিউল ইসলামের যত্নে এক বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে যার ছায়ায় আশ্রয় পাচ্ছে শত শত ভবিষ্যৎ।
এই স্কুল প্রমাণ করে দিয়েছে
ইচ্ছাশক্তি থাকলে গ্রামেও তৈরি হতে পারে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
মানবিকতা থাকলে শিক্ষা পায় সত্যিকারের অর্থ।
একটি আদর্শ স্কুল কেবল পরীক্ষার নম্বর গোনে না-মানুষ তৈরি করে।স্মার্ট স্কুল সেই মানুষ তৈরির কারখানা।
যেখানে প্রযুক্তি আছে, শৃঙ্খলা আছে, সাফল্য আছে-কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, আছে হৃদয়।
মালদার বুকে দাঁড়িয়ে এই প্রতিষ্ঠান আজ বলছে-
শিক্ষা সবার অধিকার,স্বপ্ন সবার।
আর তাই, আগামী দিনে এখান থেকেই জন্ম নেবে আরও বহু ডাক্তার, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, প্রশাসক আরও বহু ভালো মানুষ।
কালিয়াচকের আকাশে আজও প্রতিদিন ভেসে আসে শিশুদের কোলাহল, বইয়ের পাতার শব্দ, আর একটাই প্রতিজ্ঞা-জ্ঞান, বিজ্ঞান আর মানবিকতার পথে এগিয়ে চলা।
স্মার্ট স্কুল সত্যিই আজ এক আলোর নাম, এক আশার নাম, এক মানবিক বিপ্লব।