ব্রেকিং

জনতার ভরসা রেখা

দিলদার আলি,নয়া জামানা,কুশমণ্ডি:উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক গ্রাম থেকে উঠে আসা এক সাধারণ মেয়ের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প-এই গল্প শুধুই রাজনীতির নয় এটি সংগ্রামের,দায়িত্ববোধের, আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরলস অঙ্গীকারের গল্প। সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রেখা রায়। বয়স এখনও চল্লিশের কোটায় পৌঁছায়নি,....

জনতার ভরসা রেখা

দিলদার আলি,নয়া জামানা,কুশমণ্ডি:উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক গ্রাম থেকে উঠে আসা এক সাধারণ মেয়ের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প-এই গল্প....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


দিলদার আলি,নয়া জামানা,কুশমণ্ডি:উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক গ্রাম থেকে উঠে আসা এক সাধারণ মেয়ের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প-এই গল্প শুধুই রাজনীতির নয় এটি সংগ্রামের,দায়িত্ববোধের, আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরলস অঙ্গীকারের গল্প। সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রেখা রায়। বয়স এখনও চল্লিশের কোটায় পৌঁছায়নি, অথচ অভিজ্ঞতা আর নেতৃত্বে তিনি অনেক প্রবীণ রাজনীতিককেও টেক্কা দিতে পারেন। এলাকার মানুষ তাঁকে শুধুই জনপ্রতিনিধি বলে না, তাঁরা বলেন—‘আমাদের ঘরের মেয়ে’।

রাজনীতিতে তাঁর পরিচয় যতটা, মানুষের মনে তাঁর জায়গা তার চেয়েও বড়। মাঠে-ময়দানে, বিপদে-আপদে, দরিদ্রের ঘরে কিংবা প্রতিবন্ধীর পাশে-সব জায়গায় একটাই মুখ দেখা যায়, রেখা রায়। তাই কুশমণ্ডি থেকে দক্ষিণ দিনাজপুর—সব জায়গাতেই তাঁর নাম উচ্চারিত হয় ভরসা আর বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে।


শেকড়ের টানেই গড়ে ওঠা মানুষ

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কসবা ও সন্তোষরামপুরের মাটিতেই রেখা রায়ের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। গ্রামীণ পরিবেশে বড় হওয়া মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন দারিদ্র্য, কষ্ট, বঞ্চনা। পাশের বাড়ির অসুস্থ বৃদ্ধা, স্কুলে যেতে না পারা শিশু, বন্যায় ভেসে যাওয়া কৃষকের কান্না-এসব দৃশ্য তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

তাই খুব অল্প বয়স থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অদ্ভুত তাগিদ কাজ করত তাঁর মধ্যে। পড়াশোনায় তিনি উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হলেও জীবনের বড় শিক্ষা পেয়েছেন বাস্তবের মাটিতে। সংসারের দায়িত্ব, সংগ্রাম আর সমাজের সমস্যা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে তাঁর ব্যক্তিত্ব।

আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেও তিনি ভুলে যাননি নিজের অতীত। বরং সেই অতীতই তাঁকে আরও সংবেদনশীল করেছে।


রাজনীতিতে প্রথম পা:সাহসী সূচনা

২০০৪ সাল, তখনও রাজনীতির মঞ্চে তিনি পরিচিত মুখ নন। কিন্তু সমাজের পরিবর্তন আনতে হলে সংগঠনের মধ্যে ঢুকতে হবে এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু। মানুষের সেবা করার জন্য তিনি যুক্ত হন তৃণমূল কংগ্রেস-এর সঙ্গে।
২০০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যোগ দেন।শুরু হয় সংগঠন গড়ার লড়াই। ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলা,তাঁদের সমস্যার কথা শোনা, দলীয় কর্মীদের একত্র করা-এই কাজগুলোই ছিল তাঁর প্রথম দায়িত্ব।
একজন মহিলা হিসেবে রাজনৈতিক ময়দানে কাজ করা সহজ ছিল না। কটূক্তি, অবহেলা, উপেক্ষা-সবই সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি থামেননি। বরং প্রতিটি বাধাই তাঁকে আরও শক্ত করেছে।


ধাপে ধাপে নেতৃত্বের উত্থান

রেখা রায়ের রাজনৈতিক জীবন একদিনে তৈরি হয়নি। ধাপে ধাপে নিজেকে প্রমাণ করে তিনি উঠে এসেছেন।
দেউল অঞ্চলের মহিলা নেত্রী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, গ্রামের উন্নয়নে নারীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই মহিলাদের সংগঠিত করাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম লক্ষ্য।
পরে ব্লক মহিলা কমিটিতে দায়িত্ব পেয়ে তিনি আরও বড় পরিসরে কাজের সুযোগ পান। নারীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা-এসব বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে শুরু করেন।
২০১৩ সালে জেলা পরিষদ নির্বাচনে লড়াই করে তিনি নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করেন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে লড়াই করেন। ফলাফল তাঁর পক্ষে না এলেও প্রায় ৩২০০ ভোটে পরাজিত হন।
হারের পর অনেকেই পিছিয়ে যান। কিন্তু রেখা রায় আরও জোরে মাঠে নামেন। কারণ তাঁর কাছে রাজনীতি মানে কেবল জয়-পরাজয়ের খেলা নয়, মানুষের পাশে থাকার দায়িত্ব।

সংগঠনের মেরুদণ্ড

২০১৬ থেকে ২০২৩-এই দীর্ঘ সময় কুশমণ্ডি ব্লক সভাপতির দায়িত্ব সামলানো সহজ কথা নয়। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন নেতৃত্ব কাকে বলে।
প্রতিদিন কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক, সমস্যা সমাধান, নতুন পরিকল্পনা সবকিছুতেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। তিনি বিশ্বাস করেন, নেতৃত্ব মানে আদেশ দেওয়া নয় বরং সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা।
তাঁর কাজের ধরন ছিল আলাদা। তিনি অফিসে বসে নির্দেশ দেন না,সরাসরি মানুষের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেন। ফলে সাধারণ মানুষও তাঁর কাছে সহজে নিজেদের কথা বলতে পারেন।

জয়ের পথচলা

২০২১ সালের নির্বাচন ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম, মানুষের আস্থা সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ১২,৫০০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।

এই জয় ছিল শুধু একজন প্রার্থীর জয় নয়, এটি ছিল সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের জয়। সেই সময় রাজ্যজুড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উন্নয়নমূলক কর্মসূচি পৌঁছে দিতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন।
জয়ের পরেও তাঁর আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি আগের মতোই সাধারণ রয়ে গেছেন।

মানুষের রাজনীতি: তাঁর দর্শন

রেখা রায়ের কাছে রাজনীতি মানে ক্ষমতার চেয়ারে বসা নয়। তাঁর কাছে রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা।
তিনি মনে করেন,মানুষের আস্থা হারালে কোনো পদই মূল্যহীন।

তাই তিনি নিয়মিত নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। মহিলাদের নিয়ে সংগঠন গড়েন। যুবকদের কাজে যুক্ত করেন। প্রতিটি সরকারি প্রকল্প যাতে সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিজে তদারকি করেন।

সমাজসেবায় অনন্য উদ্যোগ

রেখা রায়ের কাজের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় মাঠে নামলে।
প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার দেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এসব তিনি নিয়মিত করেন। অনাথ ও দু:স্থ শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো, বই-খাতা পৌঁছে দেওয়া এসব কাজও তাঁর দৈনন্দিন দায়িত্বের অংশ।

পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় তিনি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তাঁদের রেশন, পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসুবিধা সবকিছু নিশ্চিত করতে লড়াই করেন।
মানুষের ঘরে ঘরে তাঁর উপস্থিতিই প্রমাণ করে তিনি শুধু নেতা নন-তিনি অভিভাবক।

উন্নয়নের ছাপ

তাঁর নেতৃত্বে এলাকায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
গ্রামে তৈরি হয়েছে আধুনিক কমিউনিটি হল।বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। হাইমাস্ট লাইটে আলোকিত হয়েছে অন্ধকার গ্রাম।
১৫৭টির বেশি কালভার্ট, নতুন রাস্তা, নদী ভাঙন রোধে বাঁধ এসব প্রকল্প মানুষের জীবন সহজ করেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্যোগ—সবুজায়ন। হাজার হাজার চারাগাছ লাগিয়ে তিনি পরিবেশ রক্ষার বার্তাও দিয়েছেন।

নারীর শক্তি:তাঁর মূল মন্ত্র

রেখা রায় বিশ্বাস করেন, নারী শক্তিশালী না হলে সমাজ এগোতে পারে না।
তাই তিনি মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়েছেন, প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছেন।
আজ বহু মহিলা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সংসার চালাচ্ছেন-এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য।

ব্যক্তিত্বের বিশেষত্ব

তাঁর মধ্যে নেই কোনো অহংকার। তিনি সাধারণ পোশাকেই মানুষের মাঝে থাকেন। কারও সমস্যা শুনলে সঙ্গে সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করেন।
এই সহজ-সরল আচরণই তাঁকে আলাদা করেছে।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন

রেখা রায়ের স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান প্রতিটি গ্রামে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হোক। কেউ যেন অভাবে না থাকে।তিনি বলেন,মানুষের হাসিই আমার প্রাপ্তি।

সংগ্রাম, সাহস, নিষ্ঠা আর মানুষের ভালোবাসা-এই চার স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রেখা রায়ের রাজনৈতিক জীবন। তিনি প্রমাণ করেছেন সাধারণ পরিবার থেকেও অসাধারণ হয়ে ওঠা যায় যদি ইচ্ছাশক্তি আর মানুষের জন্য কাজ করার মন থাকে।
আজ কুশমণ্ডি থেকে দক্ষিণ দিনাজপুর-সব জায়গায় একটাই নাম ভরসার প্রতীক-রেখা রায়।
তিনি শুধু রাজনীতিবিদ নন, তিনি এক আলোকবর্তিকা,যিনি পথ দেখান-জনসেবাই আসল রাজনীতি।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর