দিলীপ তালুকদার, নয়া জামানা, দক্ষিণ দিনাজপুর: গ্রামের মাটির গন্ধে,খোলা আকাশের নিচে,শিশুদের হাসির শব্দে যখন সকাল হয়-সেখানেই জন্ম নেয় এক নতুন দিনের গল্প। সেই গল্প কেবল পাঠ্যবইয়ের অক্ষরে আটকে থাকে না বরং ছড়িয়ে পড়ে মানুষের জীবনে, সমাজের পরিবর্তনে, স্বপ্নের বাস্তবতায়।দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ধূলচন্দ্রিয়া এলাকার বুকে এমনই এক স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান আজ সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে-ধুলচন্দ্রিয়া শিশু বিকাশ পাঠ ভবন।
এক সময় যা ছিল একটি ছোট্ট চারাগাছ আজ তা পরিণত হয়েছে ছায়া-দেওয়া মহীরুহে। কেবল একটি স্কুল নয় এটি আজ হাজারো শিশুর আশ্রয়, অভিভাবকদের আস্থা, আর শিক্ষকদের নিষ্ঠার প্রতীক।
২০১৬ সাল,হাতে ছিল না বড় কোনও পুঁজি, ছিল না বিশাল ভবন বা আধুনিক অবকাঠামো। ছিল শুধু একমুঠো স্বপ্ন কিছু উদ্যমী মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিজ্ঞা। সেই সময় এবনেসুর সরকারের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল পথচলা। মাত্র ৯০ জন শিক্ষার্থী আর ৬ জন শিক্ষাকর্মী নিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ ৮০০ শিক্ষার্থীর বিশাল পরিবারে পরিণত হয়েছে।
সংখ্যার এই বৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যান নয় এটি মানুষের বিশ্বাসের প্রতিফলন। আজ এই প্রতিষ্ঠানে ৪৭ জন স্থায়ী শিক্ষাকর্মী ও ১০ জন অনাবাসিক কর্মী নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের লক্ষ্য একটাই শিশুদের মেধা, মনন ও মানবিকতাকে একসঙ্গে গড়ে তোলা।
নার্সারি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন সকালে স্কুল চত্বরে যখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শিশুরা প্রার্থনা করে, তখন মনে হয়-এই মাটিতেই তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের ডাক্তার, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, শিল্পী ও সমাজনেতা।
এই বিদ্যালয়ের বিশেষত্ব হলো-এখানে শিক্ষা মানেই শুধু বইয়ের পাতা নয়। কেতাবি জ্ঞানের বাইরে জীবনের পাঠ শেখানোই তাদের মূল লক্ষ্য। স্কুল কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করেন, একটি শিশু কেবল পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচারযোগ্য নয়,তার সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস, শারীরিক সক্ষমতা ও নৈতিক মূল্যবোধ সব মিলিয়েই প্রকৃত শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়।
এই ভাবনা থেকেই চালু হয়েছে স্পোকেন ইংলিশ প্রশিক্ষণ। গ্রামের অনেক শিশুর কাছে ইংরেজি ভাষা ছিল ভয় ও সংকোচের কারণ। কিন্তু এখন তারা সাবলীলভাবে কথা বলতে শিখছে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের প্রকাশ করতে পারছে। বিশ্বায়নের যুগে এই দক্ষতা তাদের নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে রয়েছে আর্ট ও ক্রাফটের বিশেষ ক্লাস। শিশুরা নিজের হাতে ছবি আঁকে, কাগজ কেটে নানা জিনিস তৈরি করে, রঙের মাধ্যমে নিজেদের কল্পনাকে ফুটিয়ে তোলে। এই সৃজনশীল অনুশীলন তাদের মনকে প্রসারিত করে, চিন্তাকে মুক্ত করে। অনেক শিশুই ইতিমধ্যে জেলা স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে।
শারীরিক শিক্ষাকেও এখানে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিয়মিত খেলাধুলা, ব্যায়াম ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শিশুদের সুস্থ ও সবল রাখে। ফুটবল, দৌড়, লং জাম্প, যোগব্যায়াম- সবকিছুর মধ্যেই তারা খুঁজে পায় আনন্দ ও আত্মবিশ্বাস। কারণ সুস্থ দেহেই সুস্থ মন বাস করে-এই বিশ্বাসেই এগিয়ে চলেছে বিদ্যালয়।
তবে শুধু পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ নয় এই স্কুলে সারা বছর জুড়ে থাকে উৎসবের আমেজ। যেন বারো মাসে তেরো পার্বণ। বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান স্কুলের অন্যতম আকর্ষণ। গান, নাচ, নাটক,আবৃত্তি-শিশুরা নিজেদের প্রতিভা মেলে ধরে মঞ্চে। অভিভাবকদের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।
বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও সমানভাবে জনপ্রিয়। শিশুদের উচ্ছ্বাস, প্রতিযোগিতার উত্তেজনা আর পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ-সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
জাতীয় উৎসবগুলিও এখানে গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়।স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, দেশাত্মবোধক গান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা-সবকিছুতেই ফুটে ওঠে দেশপ্রেমের চেতনা। শিশুদের মনে ছোটবেলা থেকেই জাগিয়ে তোলা হয় দায়িত্ববোধ ও নাগরিক সচেতনতা।
সামাজিক দায়বদ্ধতাও এই বিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিত ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। দরিদ্র ও অসহায় মানুষ চিকিৎসা সুবিধা পান এই উদ্যোগের মাধ্যমে। ফলে স্কুলটি কেবল শিক্ষাকেন্দ্র নয় সমাজেরও ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে।
শিক্ষক দিবস ও শিশু দিবস এখানে বিশেষ উৎসবের দিন। এই দিনগুলিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের সম্মান জানায় আর শিক্ষকরা ভালোবাসায় ভরিয়ে দেন তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের।
বিদ্যালয়ের ঝুলিতে রয়েছে একাধিক সাফল্য। ‘ট্যালেন্ট সার্চ’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাদের খুঁজে বের করা হয়। কেউ গান গায়, কেউ কবিতা লেখে, কেউ বিজ্ঞানের মডেল বানায়-প্রত্যেকেই পায় নিজস্ব মঞ্চ।
বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে চালু হয়েছে ‘বিজ্ঞান মঞ্চ’। ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুরা বিজ্ঞানের মজা শিখছে।তাদের কৌতূহল জাগ্রত হচ্ছে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে। এভাবেই গড়ে উঠছে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম।
সবচেয়ে অভিনব উদ্যোগ হলো মাসে একদিন ‘মেধা পর্যবেক্ষণ’ দিবস। সেদিন নিয়মিত ক্লাস বন্ধ রেখে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ছাত্রছাত্রীদের দক্ষতা ও অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। ৯ জনের একটি বিশেষ দল এই কাজের দায়িত্বে থাকে। ফলে প্রত্যেক ছাত্রের দিকে আলাদা করে নজর দেওয়া সম্ভব হয়। এই ব্যবস্থা শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। ছাত্রীদের জন্য পৃথক উচ্চ মাধ্যমিক মহিলা ক্যাম্পাস তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে মেয়েরা নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ পরিবেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল লার্নিং ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়,তারা চায় প্রতিটি ছাত্রছাত্রী ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করুক। মানবিকতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক মূল্যবোধ-এই চার স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।
আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার স্বপ্নও দেখছে এই প্রতিষ্ঠান। সেই লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী সংযোজনের কাজ চলছে।
আজ ধূলচন্দ্রিয়া শিশু বিকাশ পাঠ ভবন কেবল একটি স্কুলের নাম নয়, এটি একটি আন্দোলন-শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার আন্দোলন। এটি একটি পরিবার, যেখানে শিক্ষকরা অভিভাবকের মতো, আর ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের ঘরের সন্তান।
এই বিদ্যালয় প্রমাণ করে দিয়েছে-ইচ্ছাশক্তি আর নিষ্ঠা থাকলে গ্রামের মাটিতেও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা সম্ভব। ছোট্ট উদ্যোগও একদিন বড় স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।
ধূলচন্দ্রিয়ার এই পাঠশালা তাই আজ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আশা, আস্থা ও আলোর প্রতীক। এখান থেকেই বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের সফল মানুষরা, যারা সমাজ ও জেলার মুখ উজ্জ্বল করবে।
স্বপ্নের এই যাত্রা থামার নয়-এগিয়ে চলাই যার একমাত্র লক্ষ্য।