
টিনা প্রামানিক,নয়া জামানা,মালদা: ভোরের আলো ফোটার আগেই কুয়াশা সরিয়ে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে মালদার হবিবপুর ব্লকের শ্রীরামপুর। দূরে সবুজ ধানের ক্ষেতে শিশির জমে আছে মুক্তোর মতো। পাখির ডাক ভেসে আসে। মাটির গন্ধে ভরা বাতাসে কাঁচা-পাকা রাস্তা ধরে হাঁটছেন কয়েকজন কৃষক। কারও কাঁধে লাঙল, কারও হাতে সারভর্তি বস্তা। গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের সামনে ইতিমধ্যেই জড়ো হয়েছে কয়েকজন পড়ুয়া। কেউ সাইকেলে, কেউ পায়ে হেঁটে। একটু দূরে সাব-মার্সিবল পাম্পের কল থেকে জল তুলছেন এক গৃহবধূ। আর রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন সোলার লাইটের খুঁটি যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছে-এই গ্রাম বদলেছে।
প্রথম দেখায় এই দৃশ্য খুব সাধারণ। কিন্তু একটু সময় কাটালেই বোঝা যায়,এখানে লুকিয়ে আছে অন্য এক গল্প। পরিবর্তনের গল্প। আত্মবিশ্বাসের গল্প। উন্নয়নের গল্প।
মালদা জেলার হবিবপুর ব্লকের শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েত আজ আর নিছক একটি গ্রাম নয়। এটি হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত উদাহরণ-কীভাবে পরিকল্পিত উদ্যোগ, সরকারি প্রকল্পের সঠিক প্রয়োগ এবং মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ মিলিয়ে একটি গ্রাম নিজের ভাগ্য বদলে ফেলতে পারে।
এখানে উন্নয়ন মানে শুধু পাকা রাস্তা নয়। উন্নয়ন মানে মেয়ের হাতে বই, বৃদ্ধের হাতে ভাতা, কৃষকের মুখে হাসি, অসুস্থ মানুষের হাতে স্বাস্থ্য কার্ড। উন্নয়ন মানে নিরাপত্তা, মর্যাদা, সম্মান।
শ্রীরামপুর সেই মানবিক উন্নয়নেরই এক বিস্তৃত ক্যানভাস।
গ্রাম, মানুষ ও গণতন্ত্রের ভিত
প্রায় ২৪ হাজার মানুষের বাস এই পঞ্চায়েতে। ভোটার সংখ্যা ১১ হাজার ৩৭২। ১১টি বুথ, ১৩ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি। সংখ্যাগুলো শুনতে হয়তো সাধারণ। কিন্তু এই সংখ্যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো।
এই পঞ্চায়েত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন প্রধান পাণ্ডব সিংহ ও উপ-প্রধান সনমুনি হাঁসদা। তাঁদের কাজের ধরন নিয়ে গ্রামের মানুষদের মধ্যে একটা আলাদা আস্থা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত গ্রামসভা হয়। অভিযোগ শোনা হয়। কাজের হিসাব দেওয়া হয়।ফলে মানুষ বুঝতে পারে-পঞ্চায়েত মানে দূরের অফিস নয়, নিজেদের ঘরের প্রতিষ্ঠান।
এক প্রবীণ বাসিন্দা বলছিলেন,
আগে অফিসে গেলে কেউ শুনত না। এখন গেলে বসে কথা শোনে। এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
গণতন্ত্রের আসল শক্তি এখানেই-মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ।
সামাজিক সুরক্ষার হাত ধরে বদলে যাওয়া সংসার
শ্রীরামপুরের প্রকৃত বদলটা চোখে পড়ে মানুষের ঘরে ঢুকলে। কাঁচা উঠোনে বসে থাকা মহিলাদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়।
স্নেহা সিংহ, আগে সংসার চালাতে প্রায়ই সমস্যা হতো। এখন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা নিয়মিত পান।সেই টাকায় দুটো ছাগল কিনেছেন। আজ সেই ছাগলই তাঁর অতিরিক্ত আয়ের উৎস।হেসে বললেন,এই টাকাটা না থাকলে কিছুই করতে পারতাম না। এখন নিজের হাতে টাকা থাকে। নিজের সম্মান আছে।
শুধু স্নেহা নন, প্রায় ৪,৫৬০ জন মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী। তাঁদের কারও বাড়িতে সেলাই মেশিন এসেছে, কেউ মুড়ি ভাজা বিক্রি করছেন, কেউ স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে যুক্ত হয়েছেন।
অর্থাৎ সরকারি ভাতা এখন আর কেবল অনুদান নয়-এটি হয়ে উঠেছে স্বনির্ভরতার বীজ।
স্বাস্থ্য সাথী কার্ডও এখানে আশীর্বাদের মতো। প্রায় ২,২০০ পরিবার এর আওতায়। একসময় অসুখ মানেই ছিল দুশ্চিন্তা। এখন হাসপাতালের বিল নিয়ে ভয় নেই।
৭০ বছরের কৃষক হরিপদ মণ্ডল বললেন, অসুখ হয়েছিল এক টাকাও খরচ হয়নি। না হলে জমি বিক্রি করতে হতো।
বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, মানবিক ভাতা-এই প্রকল্পগুলো বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষদের জীবনে এনে দিয়েছে নিরাপত্তার ছাতা। মাসের নির্দিষ্ট দিনে হাতে টাকা পাওয়া মানে আত্মসম্মান ফিরে পাওয়া।
মেয়েদের চোখে নতুন ভবিষ্যৎ
একসময় এই গ্রামে মাধ্যমিকের পর মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত। অল্প বয়সেই বিয়ে। এটাই ছিল রেওয়াজ।আজ সেই ছবিতে বদল এসেছে।কন্যাশ্রী ও রূপশ্রী প্রকল্প মেয়েদের জীবনযাত্রার গতিপথই পাল্টে দিয়েছে। ১৫৫ জন কন্যাশ্রী ও ১২৫ জন রূপশ্রী সুবিধাভোগী। স্কুলে উপস্থিতি বেড়েছে। অল্প বয়সে বিয়ে কমেছে।ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রী মৌসুমী বলল,আমি কলেজে গিয়ে শিক্ষক হতে চাই। আগে হয়তো বিয়ে হয়ে যেত।
এই স্বপ্নই আসল উন্নয়ন।

কৃষি ও পরিকাঠামোর নীরব বিপ্লব
শ্রীরামপুরের প্রাণ হলো কৃষি। মাঠের ফসলই এখানকার অর্থনীতির মূল ভরসা। কৃষক বন্ধু প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১,০০০ কৃষক সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন।বীজ, সার, আর্থিক সহায়তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিপূরণ-সব মিলিয়ে কৃষকদের ঝুঁকি কমেছে। উৎপাদন বেড়েছে।
সুশান্ত সিংহ বললেন,এখন চাষ করতে ভয় লাগে না। জানি ক্ষতি হলে সরকার পাশে থাকবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিকাঠামোর উন্নয়ন। প্রায় ১.৫ কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরি হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। ফলে বর্ষায় আর জল জমে থাকে না।
১৫টি সাব-মার্সিবল পাম্প গ্রামে পানীয় জলের সমস্যা অনেকটাই মিটিয়েছে। ১২টি সোলার লাইট রাতের অন্ধকার দূর করেছে।
এক বৃদ্ধা বললেন,আগে সন্ধ্যার পর বেরোতে ভয় লাগত। এখন রাস্তা আলোকিত।

স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও বাসস্থানের মর্যাদা
গ্রাম পরিষ্কার রাখার জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ।৬২টি শৌচালয় নির্মাণ হয়েছে।৩টি সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট বসানো হয়েছে।ফলে আবর্জনা জমে থাকে না।
নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতিতে মশা-মাছি কমেছে। রোগও কমেছে।
অন্যদিকে ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ১১২টি পরিবার পাকা ঘর পেয়েছে। আরও ৮২১টি আবেদন প্রক্রিয়াধীন।
কাঁচা চালা থেকে পাকা ছাদ-এই পরিবর্তনের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
অঞ্জলি সাহা বললেন,বর্ষায় আর জল পড়ে না। বাচ্চারা নিশ্চিন্তে ঘুমোয়।

পান্ডব সিংহ
প্রধান
শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েত
যুবসমাজ ও আগামীর স্বপ্ন
গ্রামের ভবিষ্যৎ যুবসমাজ। তাই তাদের জন্যও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।আগামীদিনে পার্ক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হবে-সব মিলিয়ে নতুন প্রজন্মকে সক্রিয় রাখারও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শ্রীরামপুর আজ প্রমাণ করেছে-উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের কাঠামো নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনে স্বস্তি, নিরাপত্তা, মর্যাদা।
মাটির পথ থেকে পাকা রাস্তা, অন্ধকার থেকে আলো, অনিশ্চয়তা থেকে নিশ্চিন্ততা-এই যাত্রাই শ্রীরামপুরের গল্প।
এই গ্রাম যেন নিঃশব্দে বলে-
সুযোগ পেলে আমরাও পারি।
শ্রীরামপুর তাই এখন আর শুধু একটি পঞ্চায়েত নয়-এটি এক অনুপ্রেরণা,এক আশার আলো,এক বদলে যাওয়া বাংলার প্রতিচ্ছবি।