নয়া জামানা,হবিবপুর:মালদার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে উন্নয়নের গল্প অনেক সময়ই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় সেই উন্নয়ন বাস্তবে চোখে পড়ে, অনুভব করা যায় দৈনন্দিন জীবনে। শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ২৩৯ নম্বর বুথের অন্তর্গত বানপুর গ্রাম এখন তেমনই এক পরিবর্তনের উদাহরণ। যেখানে প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনী ভাষণে আটকে থাকেনি, বরং রাস্তাঘাট, জল, আলো আর মানুষের মুখের হাসিতে তার বাস্তব রূপ ফুটে উঠেছে।
গ্রামীণ উন্নয়নের মেরুদণ্ড পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। স্থানীয় সমস্যার সমাধান স্থানীয় নেতৃত্বের হাত ধরেই সম্ভব-এই বিশ্বাসকে সামনে রেখেই কাজ করছেন শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রতিনিধিরা। গত কয়েক বছরে বানপুরে যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে তা শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়, মানুষের মানসিকতাতেও এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
২০২৩ সালের গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই বুথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী সনত কুমার বর্মন মাত্র ২৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। অল্প ব্যবধানের এই জয় তাঁর কাছে যেমন দায়িত্ব বাড়িয়েছে তেমনই এলাকার মানুষের প্রত্যাশাও বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। শিক্ষিত, মার্জিত ও কর্মঠ যুবক হিসেবে সনত বাবুর পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। এম.এ এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই জনপ্রতিনিধি একসময় স্থানীয় স্তরে পরিচিত ক্রিকেটারও ছিলেন। মাঠের শৃঙ্খলা ও দলগত মানসিকতাই যেন এখন তাঁর প্রশাসনিক কাজের মূল শক্তি।
নির্বাচনের আগে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন-রাস্তাঘাট সংস্কার, পানীয় জলের সুব্যবস্থা, বিদ্যুতায়ন ও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া-তার অনেকটাই ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। আড়াই বছরের মধ্যেই বানপুরের চেহারা বদলাতে শুরু করেছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে যোগাযোগ ব্যবস্থায়। একসময় কাঁচা ও ভাঙাচোরা রাস্তার জন্য বর্ষাকালে গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত।স্কুলপড়ুয়া থেকে অসুস্থ রোগী-সবারই যাতায়াতে ভোগান্তি ছিল নিত্যদিনের।এখন সেই ছবি অনেকটাই বদলেছে। শ্রীরামপুর রেলগেট থেকে খুজিপুর পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ হয়েছে। মুন্ডাপাড়া হয়ে মল্লিকপাড়া পর্যন্ত পথও সংস্কার করা হয়েছে। মুন্ডাপাড়া-চেতনপাড়া এবং চেতনপাড়া থেকে বানপুর রেলগেট পর্যন্ত রাস্তা তৈরি হওয়ায় একাধিক গ্রাম এখন সহজে সংযুক্ত।ফলে বাজার, স্কুল সব জায়গায় পৌঁছনো অনেক সহজ হয়েছে।
পানীয় জলের সমস্যাও দীর্ঘদিনের। গ্রীষ্মকালে নলকূপে জল মিলত না, মহিলাদের দূর থেকে জল আনতে হতো। এই সংকট মেটাতে বসানো হয়েছে সাব-মার্সিবল পাম্প।শুধু পানীয় জল নয়, সেচের কাজেও সহায়ক হচ্ছে। কৃষকদের কাছে এই উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চাষাবাদের জন্য জলের ওপরেই তাঁদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে।
গ্রামের সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নেও নজর দেওয়া হয়েছে। খুজিপুরের পুকুরে সিঁড়িঘাট নির্মাণ হওয়ায় স্থানীয়দের দৈনন্দিন ব্যবহার সহজ হয়েছে। বানপুরের মৌলিকপাড়াতে পুকুরের ধারে গার্ডওয়াল তৈরি করে ভাঙন রোধ করা হয়েছে। ছোট ছোট এই উদ্যোগগুলো গ্রামীণ জীবনে বড় প্রভাব ফেলে-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
শুধু ইট-পাথরের কাজেই থেমে থাকেনি উন্নয়ন। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছয়, সেদিকেও জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন করে ইতিমধ্যেই ৪০ জন মহিলা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। ৩২ জন কৃষক ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের আওতায় এসেছেন। এই সাহায্য সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে উন্নয়ন যে শেষ হয়ে গেছে, এমনটা ভাবতে নারাজ পঞ্চায়েত সদস্য নিজেই। তাঁর মতে, এখনও অনেক কাজ বাকি। আগামী দিনে রেলগেট থেকে শ্রীকৃষ্ণপুর ভাওয়ার পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ, খুজিপুর থেকে শিমুলতলা পর্যন্ত সংস্কার, খুজিপুর থেকে তিলাসন পর্যন্ত নতুন রাস্তা তৈরি—এসব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংযোগকারী ছোট রাস্তার উন্নয়ন, নতুন স্ট্রিট লাইট বসানো এবং শ্মশানে সিঁড়িঘাট ও চুল্লি নির্মাণের উদ্যোগও রয়েছে। অর্থাৎ গ্রামকে আরও আধুনিক ও সুবিধাজনক করে তুলতেই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
এই পরিবর্তনের সাক্ষী গ্রামের মানুষরাই। অসীম সিংহ, ধীরেন বর্মন, লক্ষ্মী রাম সোরেন, সন্তোষ বর্মন, মেনকা পাণ্ডে, পিঙ্কি মল্লিক, রাজ কুমার মণ্ডল-তাঁদের মতো সাধারণ বাসিন্দারা বলছেন, আগের তুলনায় এখন জীবন অনেক সহজ। আগে যেখানে সন্ধ্যার পর অন্ধকারে রাস্তায় বেরোনো মুশকিল ছিল এখন সেখানে আলো জ্বলছে। কাঁচা রাস্তার বদলে পাকা পথ, দূরের জলের বদলে বাড়ির কাছেই জল-এই ছোট ছোট বদলই তাঁদের জীবনে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে।
সনত বর্মন
সদস্য
শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েত
সনত কুমার বর্মনের কথায়, “শিক্ষা আর খেলাধুলা মানুষকে শৃঙ্খলা শেখায়। সেই শৃঙ্খলা মেনেই আমি কাজ করতে চাই। মানুষের বিশ্বাসটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।” তাঁর লক্ষ্য, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বানপুর গ্রাম কে একটি মডেল এলাকায় পরিণত করা।
বানপুরের এই পরিবর্তনের গল্প প্রমাণ করে, উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় প্রকল্প নয়-সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং সদিচ্ছাই পারে একটি গ্রামের ভাগ্য বদলে দিতে। প্রতিশ্রুতি যদি কাজে পরিণত হয়, তাহলে গ্রামও এগোয় মানুষও এগোয়।আর সেই পথেই আজ এগোচ্ছে বানপুর-নতুন দিনের প্রত্যাশায়, উন্নয়নের আলোর পথে।