দুলাল সিংহ,নয়া জামানা,দক্ষিণ দিনাজপুর: সব নেতা মাইক হাতে জন্মান না, সব সমাজসেবী পোস্টারেও থাকেন না।কেউ কেউ নীরবে, প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মধ্যেই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা শহর বালুরঘাট–এর এমনই এক পরিচিত মুখ বিপুল কান্তি ঘোষ।পেশায় একজন শিক্ষক, কিন্তু হৃদয়ে সমাজকর্মী, পরিচয়ে রাজনীতিক,কিন্তু স্বভাবে একেবারে পাড়ার মানুষ।
তাঁর জীবনগাথা কোনো প্রচারের গল্প নয়-এ এক শ্রম, সততা আর দায়বদ্ধতার দীর্ঘ যাত্রাপথ। যেখানে চক-ডাস্ট আর জনসেবার ঘাম মিলেমিশে তৈরি করেছে এক আলাদা দৃষ্টান্ত।
শিকড়ের শক্তি:ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ববোধ
বালুরঘাটের চকভবানি ঘোষপাড়ার সাধারণ পরিবেশেই বড় হওয়া। না ছিল প্রাচুর্য না ছিল প্রভাবশালী পরিচয়। কিন্তু ছিল শিক্ষার প্রতি গভীর আকর্ষণ এবং মানুষের জন্য কিছু করার প্রবল তাগিদ।
ছোটবেলা থেকেই বিপুলের বিশ্বাস ছিল-শিক্ষাই মানুষকে বদলায়, আর মানুষ বদলালে সমাজ বদলায়।
এই বিশ্বাসই তাঁর জীবনের ভিত গড়ে দেয়।
শিক্ষার পথে অবিচল যাত্রা
পড়াশোনায় বরাবরই মেধাবী। উচ্চশিক্ষার জন্য সিকিমে পাড়ি। ইংরেজিতে এম.এ, তারপর বি.এড-দুটোই কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। অনেকেই তখন কর্পোরেট চাকরি বা সরকারি উচ্চপদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তাঁর সামনে সেই সুযোগও এসেছিল।অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার পরীক্ষায় সর্বভারতীয় স্তরে প্রথম স্থান-যা যে কোনো তরুণের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হতে পারত।
কিন্তু তিনি অন্য সিদ্ধান্ত নিলেন।
তিনি বলেছিলেন,চাকরি আমাকে নিরাপত্তা দেবে কিন্তু শিক্ষকতা আমাকে মানুষ গড়ার সুযোগ দেবে।
২০০৭ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন স্থানীয় স্কুলে। সেই দিন থেকেই শুরু হয় তাঁর প্রকৃত জীবনসংগ্রাম-যেখানে বেতন নয় তৃপ্তিই ছিল মূল প্রাপ্তি।
শ্রেণিকক্ষ: তাঁর প্রথম কর্মক্ষেত্র
শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু ‘স্যার’ নন, ‘গাইড’।
ইংরেজি শেখানোর সময় গল্প বলেন, উদাহরণ দেন, জীবনের কথা বলেন। পড়াশোনা তাঁর কাছে পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়-মানুষ হওয়ার পাঠ।
অনেক ছাত্রছাত্রী আজও বলেন,
স্যার আমাদের শুধু ভাষা শেখাননি, আত্মবিশ্বাস শিখিয়েছেন।
শিক্ষক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সমাজের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে দেয়।
রাজনীতিতে প্রবেশ:প্রয়োজনের তাগিদে
রাজনীতি তাঁর কাছে কখনো ক্ষমতার সিঁড়ি ছিল না।ছিল মানুষের সমস্যার সমাধানের একটি মাধ্যম।
শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা বাড়তে থাকে। সেখান থেকেই শুরু রাজনৈতিক পথচলা।তিনি যোগ দেন তৃণমূল কংগ্রেস–এর সংগঠনে।
দল তাঁর মধ্যে দেখেছিল এক কর্মঠ, নির্লোভ, নির্ভরযোগ্য মানুষ।আর বিপুল দেখেছিলেন মানুষের জন্য বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ।

সংগঠনের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠা
বছরের পর বছর নীরবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
* জেলা শিক্ষা সেলের দায়িত্ব
* পঞ্চায়েত নির্বাচনের সাংগঠনিক কাজ
* লোকসভা নির্বাচনে সমন্বয়
* শহর কমিটির সাধারণ সম্পাদক
রাজনীতির মাঠে যেখানে অনেকেই আলো খোঁজেন, সেখানে তিনি কাজ খুঁজেছেন।

২০২২: এক নতুন অধ্যায়
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আস্থা ভোটে রূপ নেয়।পুরসভা নির্বাচনে ১১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রার্থী।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলা, মানুষের সমস্যা শোনা,প্রতিশ্রুতি নয়-সমাধানের আশ্বাস।
ফলাফল ?
৬৫০ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়।তিনি এখন পুরসভার এম.আই.সি। কিন্তু পদবির ভার তাঁকে বদলায়নি।
চেয়ার নয়,চেয়ারে বসা মানুষটাই বড়
অনেকে পদ পেলে দূরে সরে যান। বিপুল ঠিক উল্টো।
প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে কলোনিতে বসেন।
কেউ আসে রেশন কার্ডের সমস্যায়, কেউ আসে চিকিৎসার সাহায্যে, কেউ স্কুলে ভর্তি নিয়ে।
সবাইকে সময় দেন।
কখনো ফাইল, কখনো ফোন, কখনো নিজে গিয়ে দেখে আসেন।
এই সহজলভ্যতাই তাঁকে আলাদা করেছে।
সমাজসেবার গল্পগুলো
১. আশ্রয়ের স্বপ্নপূরণ
গৃহহীন পরিবারদের জন্য বাড়ি নির্মাণ। শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ তদারকি।
২. স্টুডেন্ট ফোরাম
দুঃস্থ মেধাবী ছাত্রদের বই, ফি, কোচিং-সবকিছুতে সহায়তা।
তিনি বলেন,একটা ছেলে বা মেয়েকে দাঁড় করাতে পারলে একটা পরিবার বদলে যায়।
৩. উৎসব মানেই সবার আনন্দ
দুর্গাপূজায় নতুন জামা,খাবার বিতরণ।
কারণ তাঁর মতে-উৎসব তখনই পূর্ণ,যখন সবার মুখে হাসি থাকে।
৪. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
মন্দির, মসজিদ, ক্লাব-সব জায়গায় সমান উপস্থিতি।
মানুষ আগে, ধর্ম পরে-এই বিশ্বাসেই চলেন।
পরিবার: নীরব শক্তি
তাঁর সহধর্মিণীও শিক্ষিকা। ফলে দুজনের জীবনেই ছাত্রছাত্রী, বই আর স্কুলের গল্প।
পরিবার তাঁকে শক্তি দেয়, সময় দেয়, সমর্থন দেয়।
এই সমর্থন ছাড়া এতটা পথ চলা সম্ভব নয়।
এক দিনের রুটিন
সকাল – স্কুল
দুপুর – অফিস
বিকেল – মানুষের সঙ্গে দেখা
রাত – পরিকল্পনা, কাগজপত্র
এ যেন এক নিরন্তর চক্র।
ক্লান্তি?
থাকে।
তবু থামেন না।
মানুষের চোখে বিপুল
কারও কাছে তিনি ‘স্যার’
কারও কাছে ‘দাদা’
কারও কাছে ‘কাউন্সিলর’
কিন্তু সবার কাছে ‘ভরসা’।
এই ভরসাটাই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।
নেতৃত্বের দর্শন
তিনি বিশ্বাস করেন—
* রাজনীতি মানে সেবা
* ক্ষমতা মানে দায়িত্ব
* জনপ্রতিনিধি মানে সবার আগে শ্রোতা
এই তিন নীতিতেই তাঁর পথচলা।
সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণা
আজকের দিনে যখন রাজনীতি নিয়ে মানুষের হতাশা বাড়ছে, তখন বিপুল কান্তি ঘোষের মতো মানুষ প্রমাণ করেন—সৎ ইচ্ছা থাকলে রাজনীতিও পবিত্র হতে পারে।তিনি দেখিয়েছেন—
একজন শিক্ষকও সমাজ বদলাতে পারেন,একজন সাধারণ মানুষও অসাধারণ হতে পারেন।
বিপুল কান্তি ঘোষ কোনো চলচ্চিত্রের নায়ক নন।
তাঁর নেই বিলবোর্ড, নেই বড় বক্তৃতা।
তাঁর শক্তি তাঁর কাজ।
তাঁর পরিচয় তাঁর সততা।
তাঁর গর্ব তাঁর মানুষ।
বালুরঘাটের অলিগলি দিয়ে হাঁটলে আজও দেখা যাবে-
একজন মানুষ ফাইল হাতে,মুখে হাসি, সবার সঙ্গে কথা বলছেন।
তিনি জানেন-সমাজ বদলানো যায় না এক দিনে।কিন্তু প্রতিদিন একটু একটু করে বদলানো যায়।
আর সেই বদলের কারিগরই হলেন বিপুল কান্তি ঘোষ-
চকের মাটিতে দাঁড়িয়ে যিনি গড়ে চলেছেন আলোর ভবিষ্যৎ।