নয়া জামানা ডেস্ক : কর্মসূত্রে ঘর ছেড়েছিলেন রুটিরুজির টানে। কিন্তু সেই পরবাসই কেড়ে নিল প্রাণ। মহারাষ্ট্রের পুণেতে পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতোর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। অভিযোগের তির সরাসরি বিজেপিশাসিত মহারাষ্ট্রের দিকে। অভিযোগ, স্রেফ বাংলায় কথা বলার অপরাধে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে ওই যুবককে। এই ঘটনায় সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে শুক্রবার পুরুলিয়া যাচ্ছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
জানা গেছে,বান্দোয়ানের বাসিন্দা বছর সাতাশের সুখেন মাহাতো গত সাত বছর ধরে দুই ভাইয়ের সঙ্গে পুণেতে কাজ করতেন। পরিবারের দাবি, সোমবার কাজে বেরিয়ে আর ফেরেননি তিনি। মঙ্গলবার ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। বুধবার সেই শোকের খবর পৌঁছায় পুরুলিয়ার বাড়িতে। সুখেনের বাবা ধীরেন মাহাতোর স্পষ্ট অভিযোগ, ‘ছেলেরা বাংলায় কথা বলত। সেই আক্রোশেই আমার মেজো ছেলেকে খুন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ছেলেদের বেশিদূর পর্যন্ত লেখাপড়া করাতে পারেননি। একটু বড় হতেই তিন ভাই মহারাষ্ট্রের পুণেতে এক সংস্থার কাজে চলে গিয়েছিল । যে এলাকায় তিন ছেলে কাজ করত সেখানে সকলেই মারাঠী এবং হিন্দি ভাষায় কথাবার্তা বলত। মৃতের কাকা দীনেশচন্দ্র মাহাতোরও অভিযোগ, বাংলায় কথা বলার কারণেই খুন করা হয়েছে তাঁর ভাইপোকে । ছেলের মৃত্যুতে তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছে পরিবার । পরিবারের অভিযোগের সুরে সুর মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনি বৃহস্পতিবার সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এটি একটি ঘৃণ্য অপরাধ। এক যুবককে তাঁর ভাষা, পরিচয় এবং তাঁর শিকড়ের জন্য অত্যাচার করে হত্যা করা হল।’ তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। তিনি লেখেন,আমি অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেফতারি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, ‘সুখেনের পরিবারের উদ্দেশে আমি বলছি, এই শোকার্ত সময়ে পশ্চিমবঙ্গ আপনাদের পাশে রয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সব রকম পদক্ষেপ করা হবে।’ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই স্থানীয় বিধায়ক রাজীবলোচন সোরেন এবং জেলা পরিষদের সভাধিপতি নিবেদিতা মাহাতো নিহতের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানিয়ে এসেছেন। তৃণমূলের দাবি, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালিদের টার্গেট করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টেও সুখেনের শরীরে একাধিক গভীর ক্ষত ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন মিলেছে।
তবে এই ঘটনায় মহারাষ্ট্র পুলিশের তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুণের শিখাপুর থানার পুলিশ দাবি করেছে, ঘটনার নেপথ্যে কোনও ভাষাগত আক্রোশ নেই। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সোমবার বিকেলে কাজে না গিয়ে মত্ত অবস্থায় কোরেগাঁও এলাকায় ঘুরছিলেন সুখেন। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে দুই ব্যক্তির সঙ্গে বচসায় জড়াতে দেখা গিয়েছে। পুলিশের অনুমান, সেই বিবাদের জেরেই হামলা হয়েছে। যদিও খুনের সেই মুহূর্ত সিসিটিভিতে ধরা পড়েনি। পুলিশ একে ‘বিচ্ছিন্ন ঝগড়া’ বললেও মানতে নারাজ রাজ্যের শাসকদল।
তৃণমূলের চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের দাবি, ‘বিজেপিশাসিত মহারাষ্ট্রের পুলিশ আসলে সত্য ঢাকতে অন্য তত্ত্ব খাড়া করছে।’ তাঁর মতে, গত কয়েক মাসে ধারাবাহিক ভাবে ভিনরাজ্যে বাঙালিদের হেনস্থা ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ নিজের মুখ বাঁচাতে নিহতের চরিত্র নিয়ে মিথ্যা ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল শিবির। এই টানাপড়েনের মাঝেই আজ পুরুলিয়ায় সুখেনের বাড়ি যাচ্ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবারের একমাত্র রোজগেরে ছেলেকে হারিয়ে এখন দিশেহারা মাহাতো পরিবার। তাঁদের প্রশ্ন একটাই, নিজের ভাষায় কথা বলা কি সত্যিই আজ অপরাধ?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এক লড়াকু শ্রমিকের এমন মর্মান্তিক পরিণতি তিনি মেনে নেবেন না। নবান্ন সূত্রের খবর, মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে এই ঘটনার প্রকৃত তদন্ত এবং দোষীদের সাজার দাবিতে সরব হবে রাজ্য। আপাতত শোকবিহ্বল পুরুলিয়ার এই ছোট গ্রামটি এখন তাকিয়ে আছে সুবিচারের আশায়।
আরও পড়ুন-