অঞ্জন শুকুল, নয়া জামানা, নদীয়া: মায়ের চোখ ফিরিয়ে দিল অপর একজনের দৃষ্টি। মৃত মায়ের চক্ষুদান কে কেন্দ্র করে সমাজকর্মী, বিজ্ঞানকর্মী তথা শিক্ষক আমীর চাঁদ শেখসহ তার পরিবারের সদস্যদের নিঃশর্ত জামিল মঞ্জুর করল কৃষ্ণনগর আদালত।বৃহস্পতিবার জামিনের ভার্চুয়ালি শওয়ালের পর পাঁচজনের জামিন মঞ্জুর করে আদালত।রাবেয়া বিবির চক্ষুদানের ইচ্ছা বা স্বপ্ন সফল এবং মেডিক্যাল কলেজেরও অভিনন্দন কিন্তু; তাও থেকে গেল পুলিশের অতিসক্রিয়তায় বড়সড় প্রশ্নচিহ। রাবেয়া বিবির দুটি চোখ সফল ভাবে দুজনের মধ্যে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বুধবার সমাজসেবী আমীর চাঁদের মায়ের কর্নিয়া সফলভাবে প্রতিস্থাপন হওয়ার জন্য মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। প্রসঙ্গত রক্ষণশীলতার বেড়া ভেঙে মৃত মায়ের চক্ষুদান করে চরম মাশুল দিতে হয়েছে সমাজকর্মী আমীরচাঁদ ও তাঁর পরিবারকে। এই পরিবারের ৫ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের এই গ্রেফতার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সোমবার ধৃতদের কৃষ্ণনগর আদালতে তোলা হলে বিচারক তিন দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে বৃহস্পতিবার আদালতে ধৃত ৫ জনকে তোলা হয়। উল্লেখ্য, রবিবার বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় সেনপুরের বাসিন্দা রাবেয়া বিবির (৬৫)। তিনি জীবিত অবস্থাতেই ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর বিখ্যাত সংস্থা ‘গণদর্পণ’-এর মাধ্যমে মরণোত্তর অঙ্গদানের অঙ্গীকার করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি ও চিকিৎসকরা এসে নিয়ম মেনে কর্নিয়া সংগ্রহ করেন। গণদর্পণ থেকে এ নিয়ে পুলিশের কাছে একটি চিঠিও পাঠানো হয়। কিন্তু সেদিন বিকেলে এই ঘটনা জানাজানি হতেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। প্রতিবেশীদের একাংশ বাড়ির লোকজনের ওপর চড়াও হয়। বাড়ি ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ।উত্তেজিত পরিস্থিতির মধ্যে এক প্রতিবেশী অভিযোগ করেন যে, পরিবারের সদস্যরা মৃত রাবেয়া বিবির চোখ ‘বিক্রি’ করে দিয়েছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ আমির চাঁদ, তাঁর কন্যা ও পুত্রবধূসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় মঙ্গলবার ক্ষোভে ফেটে পড়ে কোতোয়ালি থানার সামনে সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একইসঙ্গে কোতোয়ালি থানার আইসি অমলেন্দু বিশ্বাসকে আমীরচাঁদের নি:শর্ত মুক্তি ও একাধিক দাবি তুলে একটি স্বারকলিপি প্রদান করা হয়। তারপর এদিন মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে আমীরচাঁদকে পাঠানো চিঠি নি:সন্দেহে অন্যদিক বহন করে। সেই চিঠিতে লেখা আছে, ‘দানকৃত অঙ্গগুলি যথাসময়ে ও ভাল অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। দুইজন অন্ধ ব্যক্তির দৃষ্টি পুনরুদ্ধারে উপযুক্ত করা হয়েছে। আমরা বিনীতভাবে কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করছি ও আশা করছি যে মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট মহান ব্যক্তিরা কর্নিয়ার কারণে অন্ধত্ব দূরীকরণে সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।’ রাবেয়া বিবি মারা গেলেও তাঁর চোখ দিয়ে দেখছেন। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এই প্রসঙ্গে এপিডিআর-এর তাপস চক্রবর্তী বলেন,’ আমরা প্রথম থেকে এই বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হয়ে ছিলাম। পুলিশ এমনকি বিচারকের ভূমিকাও ঠিক নয়। আজকে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন ও মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানোর মাধ্যমে পরিস্কার হয়ে গেল চোখ বিক্রির বিষয়টি কত বড় ষড়যন্ত্র। বৃহস্পতিবার ভার্চুয়ালি জামিনের আবেদন করা হয় পাঁচজনের। অবশেষে বিচারক পাঁচ জনের জামিন মঞ্জুর করেন।
আরও পড়ুন-
হারিয়ে যাওয়া শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারের হাতে ফিরিয়ে দিল শান্তিপুর থানা