তৈমুর খান
গোলাম রসুলের কাব্যজগতে এক গভীর ও নিবিড় দুঃখের সঞ্চরণ পরিলক্ষিত হয়, যা তাঁর প্রতিটি কবিতায় ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ধরা দেয়। তাঁর অন্তর সত্তার এই দুঃখ কেবল ব্যক্তিগত বিরহ নয়, বরং তা অস্তিত্বের সংকট, একাকিত্ব এবং সময়ের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। তাঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ থেকে এই দুঃখের স্বরূপ তুলে আনা সম্ভব।
১. একাকিত্ব ও অস্তিত্বের হাহাকার
কবির অন্তর সত্তায় দুঃখের অন্যতম রূপ হলো তাঁর চরম একাকিত্ব। তিনি নিজেকে এক “দুঃখের শহরে” বন্দি অনুভব করেন, যেখানে একাকীত্বই তাঁর একমাত্র সঙ্গী।
উদ্ধৃতি: “হাহাকারের পীড়িত বাজনার বাড়িটাতে আমি একা”।
উদ্ধৃতি: “বিবর্ণ তরঙ্গহীন একাকিত্বের ডাঙার ওপর / একঝাঁক বাজপাখির সঙ্গে আমরা”।
উদ্ধৃতি: “ওৎ পেতে বসে রয়েছে একাকিত্বের সম্রাট”।
২. শৈশব ও স্মৃতির বিষাদ
হারানো শৈশব এবং মৃত পূর্বপুরুষদের স্মৃতি কবির চেতনায় এক ধরণের গভীর বিষণ্ণতা তৈরি করে। তাঁর কাছে শৈশব যেন এক “মৃত সন্তান” বা “কুয়াশা”।
উদ্ধৃতি: “হারিয়ে যাওয়া জলাধারের ধারে আমি একা / আমার ছেলেবেলা / মৃত সন্তান সব এখন কুয়াশা”।
উদ্ধৃতি: “আমি পূর্বপুরুষদের ঝরে যাওয়া কান্না শুনতে পাচ্ছি”।
৩. জীবন ও সময়ের নিষ্ঠুরতা
কবির দর্শনে জীবন এক ক্লান্তিকর যাত্রা, যেখানে সময় নিষ্ঠুর এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি বর্তমান শতাব্দীকে “অন্ধ” হিসেবে দেখেন।
উদ্ধৃতি: “সত্যি একটা অন্ধ দুঃখ হাত এগিয়ে দিচ্ছে আর আমি একা আকাশে হাঁটছি”。
উদ্ধৃতি: “এই দুঃখের শহরকে বারবার স্থাপন করেছে দিগন্তের গায়”।
উদ্ধৃতি: “আমাদের সাধারণ কজনের ভাগ্য ছিল এমনই নিষ্ঠুর”।
৪. মৃত্যুচেতনা ও সংক্রামক দুঃখ
গোলাম রসুলের দুঃখবোধের গভীরে রয়েছে মৃত্যুচেতনা। কবরখানা, কফিন এবং শ্মশানের চিত্রকল্প তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে, যা জীবনের নশ্বরতাকে তুলে ধরে।
উদ্ধৃতি: “সূর্য ডুবছে সংক্রামক দুঃখের নৌকার মতো”।
উদ্ধৃতি: “অতীত দুঃখবোধের শূন্যতা ছোটো হয়ে এসেছে / প্রকৃতির মহাশোক”।
উদ্ধৃতি: “মৃত্যুর সাদা রঙ যেমন হয় তারপর ফাঁপা অন্ধকার”।
সংক্ষেপে বলা যায়, গোলাম রসুলের অন্তর সত্তার দুঃখ এক ধরণের মেটাফিজিক্যাল বা আধিভৌতিক হাহাকার। তিনি জগতের সুন্দর বিষয়গুলোকেও দুঃখের চশমায় দেখেন—যেখানে নক্ষত্ররা পাথর ছোড়ে এবং চাঁদ “পারমাণবিক দুঃখের” প্রতীক হয়ে ওঠে। এই নিরন্তর দুঃখবোধই তাঁর কবিতাকে এক অনন্য জীবন দর্শনে উন্নীত করেছে।