নয়া জামানা ডেস্ক : ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে প্রধান বা সভাধিপতিদের কুর্সি কাড়তে এখন থেকে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত তিন বছর। বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের শেষলগ্নে আচমকাই ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পঞ্চায়েত (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ পাশ করিয়ে নিল রাজ্য সরকার। আগে এই সময়সীমা ছিল আড়াই বছর। অর্থাৎ, বোর্ড গঠনের তিন বছরের মধ্যে আর কোনো পদাধিকারীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা যাবে না। বিরোধীদের প্রবল আপত্তির মধ্যেই শনিবার ধ্বনিভোটে এই সংশোধনী বিল পাশ হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ঘরোয়া কোন্দল সামাল দিতেই এই আইনি বর্ম তৈরি করল শাসকদল।
শনিবার ছিল বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের শেষ দিন। দুপুর পর্যন্ত এই বিলের কোনো উচ্চবাচ্য ছিল না। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে তড়িঘড়ি কার্যবিবরণী কমিটির বৈঠক ডাকা হয়। সেখানেই স্থির হয়, পঞ্চায়েত আইনের সংশোধনী আনা হবে। বিকেলের অধিবেশনে বিলটি পেশ করেন পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার। সরকারের যুক্তি, পঞ্চায়েতের কাজে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা আনতেই এই পদক্ষেপ। বর্তমানে রাজ্যে ৩,৩৩৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত, ৩৪৫টি পঞ্চায়েত সমিতি এবং ২১টি জেলা পরিষদ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭৫ হাজার জনপ্রতিনিধিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।
বিলটির স্বপক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার বলেন, ‘ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের স্থিরতা বহাল রাখতেই নতুন এই সংশোধনী বিলটি আনা হয়েছে।’ তাঁর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও ভালো কাজ করার পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। ঘনঘন অনাস্থা প্রস্তাব এলে উন্নয়ন ব্যাহত হয়, তাই এই সময়সীমা বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। শাসকদলের বিধায়ক অপূর্ব সরকার ও সমীর জানাও এই বিলের সমর্থনে সরব হন। তাঁদের মতে, গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়নে এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে এই তড়িঘড়ি বিল পাশ করানো নিয়ে রণংদেহি মেজাজে ধরা দেয় বিজেপি। দক্ষিণ কাঁথির বিজেপি বিধায়ক অরূপকুমার দাস এবং বিধায়ক বিশ্বনাথ কারক কড়া ভাষায় এই বিলের সমালোচনা করেন। বিরোধীদের মূল অভিযোগ, পঞ্চায়েতের ভেতরে শাসকদলের যে উপদলীয় কোন্দল চলছে, তা ধামাচাপা দিতেই এই আইনের পরিবর্তন। অরূপকুমার দাস বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আসলে পঞ্চায়েতের স্থিরতা নয়, বিধানসভা ভোটের আগে নিজেদের দলের স্থিরতা বজায় রাখতেই জরুরি ভিত্তিতে এই ধরনের বিলটি বিধানসভায় পেশ করা হয়েছে।’ তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘আচমকাই সময়সীমা বাড়িয়ে আড়াই বছর থেকে তিন বছর করা হল কেন? আর এক মাসের মধ্যেই তো রাজ্যের বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে যাবে। তাই এই তড়িঘড়ি তৎপরতা দেখেই আমাদের সন্দেহ হচ্ছে।’
বিরোধীদের আরও অভিযোগ, এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্রামীণ ও শহর স্তরে গণতান্ত্রিক কাঠামোগুলিকে দুর্বল করে দিয়েছে। অরূপবাবুর দাবি, গ্রাম সভা এবং শহরাঞ্চলের ওয়ার্ড কমিটিগুলিকে কার্যত তুলে দেওয়া হয়েছে। এবার জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা এড়াতেই অনাস্থার পথ বন্ধ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের জুলাই-অগস্ট মাস নাগাদ রাজ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত গঠিত হয়েছিল। সেই হিসেবে আড়াই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এই আইনি রক্ষাকবচ কার্যকর হলে বর্তমান বোর্ডগুলি আগামী কয়েক বছর কার্যত নিষ্কণ্টক হয়ে যাবে।
আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, বিধানসভায় বিল পাশ হলেও তা আইনে পরিণত হতে রাজ্যপালের সই আবশ্যিক। এখন ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পঞ্চায়েত (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ রাজভবনে পাঠানো হবে। রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস এই বিলে স্বাক্ষর করলে তবেই তা কার্যকর হবে। রাজভবন ও নবান্নের বর্তমান সম্পর্কের রসায়নে রাজ্যপাল এই বিলে দ্রুত সই করবেন কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে সরকারের এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ গ্রামীণ রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে পঞ্চায়েত আইনের এই আমূল বদল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে প্রশাসনিক স্তরের চেয়েও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা অনেক বেশি কাজ করছে। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপে মূলত তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দিক উঠে আসছে । প্রথমত, তৃণমূলের অন্দরে পঞ্চায়েত স্তর থেকে যে গোষ্ঠীকোন্দলের খবর মাঝেমধ্যেই সামনে আসে, তার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ হলো অনাস্থা প্রস্তাব। দলের এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর প্রধানকে সরিয়ে দিতে অনাস্থার আশ্রয় নেয়। তিন বছরের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ায় বিধানসভা ভোটের আগে এমন ঘরোয়া বিবাদ সামলানোর সুযোগ পেল তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। দ্বিতীয়ত,ভোটের আগে দলবদলের হাওয়া প্রবল থাকে। অনেক সময় বিরোধীরা শাসকদলের অসন্তুষ্ট সদস্যদের টেনে নিয়ে বোর্ড দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু তিন বছর পর্যন্ত অনাস্থা আনা যাবে না । এই নিয়মের ফলে বিরোধীদের পক্ষে কোনো পঞ্চায়েত বা জেলা পরিষদ দখল করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। এটি বর্তমান ক্ষমতাসীন বোর্ডের জন্য একটি মজবুত রাজনৈতিক রক্ষাকবচ। তৃতীয়ত,বিধানসভা নির্বাচনের আগে গ্রামবাংলায় যদি ঘনঘন পঞ্চায়েত প্রধান বদল হয় বা বোর্ড পড়ে যায়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যায়। সরকার চাইছে উন্নয়নমূলক কাজ যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে। তিন বছরের নিশ্চয়তা থাকলে প্রধান বা সভাধিপতিরা ভোটের আগে নির্ভয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারবেন।
এদিকে বিজেপি তথা বিরোধীদের দাবি, এই বিল আদতে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার নামান্তর। তাদের মতে, কোনো প্রধান যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হন বা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তবে তাঁকে আড়াই বছরের মাথায় সরানোর যে আইনি পথ ছিল, তা বন্ধ করে দেওয়া হলো। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যা বিরোধীরা নির্বাচনী প্রচারে হাতিয়ার করতে পারে। সব মিলিয়ে, বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগে পঞ্চায়েতের এই ‘অ্যামেন্ডমেন্ট’ তৃণমূলের জন্য ঘরের বিবাদ সামলানোর অস্ত্র হলেও, বিরোধীদের হাতে নতুন ইস্যু তুলে দিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলবে। ফাইল ফটো।
আরও পড়ুন-