নাসির ওয়াদেন
‘ বাংলা কবিতা, বাংলার কবিতা ‘ বিষয়ে বিশদে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রবন্ধে বাংলা কবিতার জানা-অজানা বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিবহল হতে পারা, আপ্লুত হওয়া প্রেরণা উদ্রেক করে। সমৃদ্ধ হই তখনই যখন যে, বাংলা কবিতা হেরে যাওয়ার কবিতা নয়। কিন্তু , বাংলা কবিতার মান মর্যাদা যেভাবে বিশ্বের সরোবরে প্রস্ফুটিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেভাবে উচ্চকিত ও পল্লবিত হতে পারছে না। কবি ও নিবন্ধক সুবোধ সরকার একটি নিবন্ধে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কবিতা যাপনকালে যে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনায় অতীত, বর্তমান সম্পর্কে বাস্তব ও নিজস্ব উপলব্ধির কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আগামীতে বাংলা কবিতা কি কি করণের বিনিময়ে বিশ্বে আলোকিত ও আলোচিত হতে পারে।
বাংলা একটি ভাষা, যা বিশ্বের ভাষাসমূহের মধ্যে অন্যতম ভাষা নিঃসন্দেহে। এই ভাষার জন্মকাল সার্ধ সহস্রবর্ষ বলে মনে করা হলেও হয়তো এর বীজ অনেক গভীরে।রাজানুকূল্যে দেশের ভাষা পরিবর্তিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সেই পথ-পরিক্রমার ভেতর দিয়েই এই ভাষা বিভিন্ন পথ ও মতের শীলন দ্বারা নতুনতর ও পরিমার্জিত এবং পরিশীলিত হয়েছে সভ্য সমাজে। বিশ্বের ৩২ কোটি বাংলাভাষী জনের দৈনন্দিন আচার, ব্যবহার, কার্যাবলী এবং কার্যপ্রণালী সম্পাদনের অন্যতম ভাষা বাংলা। বাংলা ভাষা আজ বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকের মনে ঘাসের উপর পতিত শিশির বিন্দুর মতো জ্বলজ্বল করে, কারণ একমাত্র এই ভাষায়ই স্নাত হয়েছে শহীদের রক্তের শুদ্ধতা দিয়েই। তাই তো ” এ বাংলা ও বাংলাতে এই দিনটি একটা আবেগের দিন, বাঙালির উৎসবের দিন। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি জাতি তার নিজস্ব মাতৃভাষার তথা বাংলা ভাষাকে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই রাষ্ট্রের শুধু জন্ম দেয়নি, আদায় করেছে মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।” তাহলে প্রশ্ন আসে, কেনো তবুও বিশ্বের গরিষ্ঠ ও বরিষ্ঠ জনগণের কাছে এই ভাষা ব্রাত্য হয়ে আছে। এর মূল কারণ ও উপাদানসমূহ নিখুঁতভাবে প্রাবন্ধিক লিপিবব্ধ করেছেন। এই উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রের অসংখ্য ভাষার মধ্যে যে ১৪-১৫ টি ভাষাকে সরকারি কাজে ব্যবহার হতে দেখি, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাতে বাংলাভাষার আক্ষরিক উচ্চারণ সর্বাধিক। তথাপি কন্নড়, মালায়ালাম, উডিয়া, মারাঠী, পাঞ্জাবি, তেলুগু, গুজরাটি ইত্যাদি ভাষা স্বকীয়তায় ভাস্বর নিজ নিজ রাজ্যে। তারা কেউ নিজ রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করতে পারেনি, সংকীর্ণতা ও নির্দয়তার করাতের ছোবলের কারণে। নির্বুদ্ধিতা বলা যেতে পারে, কেননা, বঙ্গানুবাদ যে ভাষাকে ভাষা সাগরের অগাধ জলে মিশিয়ে দিতে পারে, ভারতীয়দের মনে আত্মবোধ, আত্মমর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তা উপলব্ধি করার মতো ইচ্ছা বা অভিপ্রায় প্রায় নেই বললে অত্যুক্তি হবে না। হীন সংকীর্ণতাবোধ ও জ্ঞাতি অ-কুটুম্বিতাকে স্বীকার করা হয়। সত্যিই তো আমাদের ভাষার কিছু কবি, অনুবাদিক বিভিন্ন ভাষায় লিখিত কবিতা, সাহিত্য বোধকে যদি অনুবাদের মাধ্যমে না নিয়ে আসতো, বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত না হতো,তাহলে তার রসাস্বাদন হয় কি করে। ‘চর্যাপদে’র কবিকূলের রস বিশ্বের দরবারে পৌঁছে যেতে পারত; কিন্তু পারেনি সঠিকভাবে পরিবেশন করার মাধ্যমকে ব্যবহার করতে না পারার অক্ষমতা থেকেই। আমরা বাংলাভাষায় অশুদ্ধির ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা যুদ্ধে শামিল;কিন্তু যদি পাশ্চাত্য সাহিত্যের ভেতর প্রভাতী আলোকরশ্মি দিয়ে পরখ করি, তাহলে অনুধাবন করা যেতেই পারে যে,”বিউলফ” কীভাবে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল,যা আমাদের “চর্যাপদ” সেভাবে ডানা মেলে বিশ্বে পাড়ি দিতে সক্ষম হয়নি। কারণ তো অনুমেয়, যে শাসকূলের সাহচর্যে ভাষা প্রাণশক্তি লাভ করে, তা প্রমাণিত। অনুবাদের মাধ্যমে মহাকবি ইকবাল কে চিনেছি, পাবলো নেরুদা, মার্কেজ, বাইনার মারিয়া রিলকে, পাররার, শেক্সপিয়ার, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী, কিটস, বোদলেয়ার-কে জেনেছি; কিন্তু আমাদের রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, নজরুল, জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, সুনীল, অলোকরঞ্জন,শঙ্খ, নীরেন্দ্র নাথ প্রমূখ কবিদের বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। পারিনি নিজের ভাষাকেই নিজেদের মধ্যে আপন করে নিতে। বাংলা কবিতার জগতে যে চব্বিশ ঘন্টার নয়, প্রভাত থেকে সান্ধ্যকালীন সময়টুকুতে দীপ্ত নয়, সারা বছরের, সারা জীবনের রৌদ্র-মজ্জায় শানিত হতে পারে তারজন্য আমাদের নিজেদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তর্দেশীয় ভাষার সহমিলন ও সহযোগ আশু প্রয়োজন। যে প্রস্তাবের কথা প্রাবন্ধিকদের মধ্যে থেকে চিহ্নিত হয়েছে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন অতীব প্রয়োজন। তাহলেই বাংলাভাষা আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারবে।
সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আমরা কিছুটা দেশ ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়ে বিদেশের মাটিতে কবিতাকে ছুঁয়ে নিতে পেরেছি, তাও বাঙালির হৃদয়ে মাত্র। এককণা বিদেশী মাটিতে আমাদের কবিতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি, বিশ্বের সকল নাগরিকের মনে পৌঁছে দিতেও পারিনি। বিশ্বের সকল নাগরিকের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারিনি বাংলার রস, সার ও সারস্বত। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে দ্বিধা নেই যে, আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলার বিচরণ চলছে তীব্র গতিতে। আমার একজন সহকর্মী কিছুদিনের জন্য তাঁর স্বামীর কর্মক্ষেত্রে, বার্সিলোনায় অবস্থান করছিলেন। তিনি সেখানে ইন্টারনেটের দৌলতে বাংলা কবিতা পড়তে পেরেছেন এবং কবিতার স্থানকে জ্বলজ্বল করে ফুটতে দেখেছেন। নামিদামি লেখকদের কবিতা পড়তে পেরেছেন, এমনকি অধমের কবিতার উপস্থিতি দেখে তিনি আপ্লুত। সে-দেশীয় তাঁর বন্ধুর কাছে ব্যাখ্যা করে গর্বিত হয়েছেন।
বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুধাবন করতে গিয়ে বলতে চাই যে, বাংলাভাষার সীমাবদ্ধতা নয়, ইউনেস্কোর হিসাব মতো বিশ্বে কম বেশি ছয় হাজার ভাষার মধ্যে গড়ে ১৫ দিন অন্তর একটি ভাষা লোপ পাচ্ছে। বর্তমানে ৬০-৮০টি ভাষা খাদের কিনারে দণ্ডায়মান, যেকোনো মুহূর্তে ঝুলে পড়তে পারে অতলে । এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও বাংলাভাষাকে প্রযুক্তিবান্ধব ও ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে ৩০ টি দেশের ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাভাষা অবাঙালি শিক্ষার্থীরা পঠন পাঠনের সুযোগ পাচ্ছে। ফলে অচিরে এই ভাষা বিশ্বে যে তৃতীয় ভাষা হিসেবে মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠান প্রাপ্তির পথে তার বলার অপেক্ষা রাখে না। পশ্চিমী বা চীন-জাপানের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে বোঝা যায় যে, একটা ভাষা বিকাশে ও প্রসারের পেছনে অর্থনীতির বড়ই ভূমিকা। এখন মানুষ, রাজনীতির মানুষ নয়, মানুষ অর্থনীতির। বাংলা ভাষাভাষীর ৪০ শতাংশ মানুষ এখনো নিরক্ষর, ফলে ভাষার উন্নতি সাধনে ওই অংশের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ প্রয়োজন। এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের মধ্যে দিয়ে সমৃদ্ধ করে ধ্রুপদী সাহিত্য হিসেবে বাংলাকে মর্যাদা প্রদান করা জরুরী অনতিবিলম্বে। তার জন্য প্রয়োজন দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা। ভারত রাষ্ট্রের সরকারকে হতে হবে উদার, মুক্তমনা এবং সহিষ্ণু, যার মাধ্যমেই ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষাসমূহ আত্মস্থ ও অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হবে। ‘Literature is the reflection of human mind ‘ অর্থাৎ মানব মনের প্রতিচ্ছবি। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যকে ব্যাখ্যা করেছেন, ভাষায় অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করে তোলা সাহিত্যের কাজ। সাহিত্যিক নীরদ চন্দ্র চৌধুরী বলেছেন যে, বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পড়ে ইংরেজি ভাষা-ভাষী পাঠকদের ঢালাও মন্তব্য ” হাউ ইন্টারেস্টিং “। যদিও বাংলা ভাষার ক্রিয়ার কাল অন্য ভাষার অনুবাদে একটি চ্যালেঞ্জ। ক্রিয়াপদ দিয়েই সব-ভাষায় কাল নির্ণীত হয়; কিন্তু ইংরেজিতে ক্রিয়ার কাল ব্যবহারেও বিভ্রান্তি ঘটে। বাংলায় ক্রিয়াপদ ছাড়াই ভাষা ব্যবহৃত হলেও ইংরেজিতে ক্রিয়াপদ ছাড়া শুদ্ধ নয়। ফলে অনুবাদের ক্ষেত্রেও জটিলতা বৃদ্ধি ঘটে।
পরিশেষে, অনুবাদ সাহিত্যের বাস্তবতা ও গুণমান নিয়ে বলতেই পারি যে, এই মাধ্যমই একমাত্র বিশ্বের ভাষাসাগরে মিলনের সেতুবন্ধনে রামচন্দ্রকে হনুমানদের সহযোগিতা করার ভেতর দিয়ে আগাম প্রজন্মকে এগিয়ে যেতে হবে তার অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে। তাই অনুবাদের বিশেষত্বের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। জার্মান মহাকবি হাইনের Book of Songs হামবুর্গ থেকে প্রকাশিত হয়, তারপর সেই বইটি বাউরিংয়ের হাতে ইংরেজিতে অনুদিত হলে,বিশ্বের সাহিত্য অঙ্গনে হাইনে উজ্জ্বলতর তারকা হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। তরুণ রবীন্দ্রনাথ সেই ইংরেজি পড়েই তাকে বাংলায় অনুবাদ করেন এবং হাইনে ভক্ত হয়ে পড়েন। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ চীন ভ্রমণের সময় বলেছিলেন ” I also wanted to know German Literature by reading Heine in translation.I thought I had caught a glimpse of the beauty there “। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলা কবিতার মান পৌঁছে যাবে বিশ্বের অলিতে গলিতে এবং ভারতবাসীর প্রতিটি হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে, শুধুই প্রয়োজন সঠিক মানের অনুবাদকের। এই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।