নয়া জামানা,কলকাতা : বাজেট অধিবেশন ঘিরে তপ্ত হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে আলোচনা চলাকালীন বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পলের এক বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার সাক্ষী থাকল কক্ষ। সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিজেপি বিধায়কের ‘ক্রিমিনাল’ তকমা দেওয়ার অভিযোগ উঠতেই রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় বিধানসভা। পাল্টা মেজাজে জবাব দেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম ও সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। পরিস্থিতি সামলাতে শেষ পর্যন্ত আসরে নামতে হয় স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বাদ দেওয়া হয় বক্তব্যের বিতর্কিত অংশ।
এদিন বিধানসভায় সংখ্যালঘু উন্নয়ন দফতরের বাজেট বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা চলছিল। আসানসোলের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল রাজ্য সরকারের ‘তোষণনীতি’ নিয়ে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করেন, বাম আমলে যেখানে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৭২ কোটি টাকা, বর্তমান তৃণমূল সরকার তা বাড়িয়ে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি করেছে। বরাদ্দ প্রায় ১২ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কেন এই সম্প্রদায়ের প্রকৃত আর্থ-সামাজিক উন্নতি হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। এর পরেই তিনি সেই বিতর্কিত মন্তব্যটি করেন। অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘এত টাকা খরচের পরেও এই সমাজ থেকে কেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইএএস, আইপিএস বা বিজ্ঞানী তৈরি হচ্ছে না ? কেন এখান থেকে শুধুই ক্রিমিনাল তৈরি হচ্ছে ?’
অগ্নিমিত্রার মুখ থেকে ‘ক্রিমিনাল’ শব্দটি বেরোনো মাত্রই ট্রেজারি বেঞ্চ ফেটে পড়ে বিক্ষোভে। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। তিনি চিৎকার করে এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘সংখ্যালঘুরা ক্রিমিনাল নয়। আপনারা এভাবে একটা গোটা সমাজকে অপমান করতে পারেন না।’ ফিরহাদ আরও যোগ করেন, সংখ্যালঘুরা এই দেশের সম্পদ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে দেশ গঠনে এই সম্প্রদায়ের অবদানের কথা বিজেপি বিধায়ককে মনে করিয়ে দেন মন্ত্রী। তিনি একে একে কাজী নজরুল ইসলাম, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এবং এপিজে আব্দুল কালামের নাম উল্লেখ করে জানান, এই পবিত্র ভূমি গড়তে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। যারা বিভাজনের রাজনীতি করে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাকে ‘অসভ্যতা’ বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। ফিরহাদ স্পষ্ট দাবি তোলেন, অগ্নিমিত্রাকে অবিলম্বে তাঁর শব্দ প্রত্যাহার করতে হবে।
বিতর্ক সেখানে থামেনি। পরে বিধানসভার বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অগ্নিমিত্রা পলের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন রাজ্যের প্রবীণ মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। অগ্নিমিত্রার এই মন্তব্যকে ‘সংবিধান বিরোধী’ বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি। সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলেন, ‘অগ্মিমিত্রা যা করেছেন তা সংবিধান বিরোধী ৷ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তাঁর ক্ষমা চাওয়া উচিত ৷ এঁরা ভারতের ইতিহাস জানে না ৷ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জানে না ৷ ধর্মনিরপেক্ষতা কী জিনিস জানে না ৷ এই রকম মহিলাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া উচিত ৷’
অন্যদিকে, অগ্নিমিত্রা তাঁর বক্তব্যে রাজ্য সরকারের কর্মসংস্থান নীতিকেও বিঁধেছেন। তাঁর অভিযোগ, যুবসমাজকে স্থায়ী কাজ না দিয়ে মাত্র ১৫০০ টাকার ভাতা দিয়ে সরকার তাঁদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ড প্রসঙ্গ টেনেও তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। দুই পক্ষের বাদানুবাদে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়কে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তিনি উভয় পক্ষকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে জানিয়ে দেন, বিধানসভায় দাঁড়িয়ে কোনও ধর্ম বা জাতিকে নিয়ে অসাংবিধানিক শব্দ ব্যবহার করা অনুচিত। এর পরেই তিনি রুলিং দেন যে, অগ্নিমিত্রা পলের বক্তব্যের আপত্তিকর অংশটি সভার কার্যবিবরণী বা রেকর্ড থেকে চিরতরে বাদ দেওয়া হবে। বাজেট অধিবেশনের এই সংঘাত রাজ্যের রাজনৈতিক আঙিনায় নতুন করে মেরুকরণের বিতর্ক উসকে দিল।
আরও পড়ুন-
হারিয়ে যাওয়া শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারের হাতে ফিরিয়ে দিল শান্তিপুর থানা